|
স্থাপত্যের ভাবনা, নকশার পেছনের গল্প এবং পেশাগত অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করতে ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস বাংলাদেশ (বাস্থই) নিয়মিত আয়োজন করে থাকে ‘স্থাপত্য ও দর্পণে স্থপতি’ শীর্ষক সেমিনার সিরিজ। এর চতুর্থ পর্ব অনুষ্ঠিত হয় গত ১৭ অক্টোবর ২০২৬ বাস্থই মাল্টিপারপাস হলে। এবারের পর্বের প্রধান আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট স্থপতি ও স্থাপত্য শিক্ষক এ. বি. এম. মাহবুবুল মালিক প্রিন্স। তিনি বর্তমানে আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। বাংলাদেশের স্থাপত্যশিক্ষা ও পেশাগত চর্চায় তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। স্থপতি প্রিন্স ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্থাপত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন। জুরি বোর্ডের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে তিনি ‘আহসানুর রহমান গোল্ড মেডেল’ অর্জন করেন। সেমিনারে তিনি তাঁর পেশাগত ও শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা, স্থাপত্যকে দেখার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং নকশার পেছনের চিন্তা ও দর্শন তুলে ধরেন। |
|
তাঁর স্থাপত্যচর্চার শুরুর দিকে নির্ণয় উপদেষ্টা লিঃ-এর প্রধান স্থপতি কাজী আনিসউদ্দিন ইকবালের সাথে বেশকিছু কাজ করেন। এসময়ের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে মহাখালীর স্কয়ার সেন্টার এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০০ শয্যাবিশিষ্ট খান জাহান আলী হলের নকশা প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হওয়া, যেটি পরবর্তীতে নির্মাণ করা হয়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নকশায় শিক্ষার্থীদের বসবাস ও বিভিন্ন কাজের জন্য উপযুক্ত জায়গা তৈরি, প্রাকৃতিক বাতাস চলাচলের সুযোগ এবং বিভিন্ন তলার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল। |
|
এই প্রকল্পগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে ব্যবহারিক প্রয়োজন, পরিবেশের বিষয়গুলো এবং স্থাপত্যের নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি একইসাথে একটি নকশাকে স্বতন্ত্র করে তোলে। এছাড়া খুলনার হাজী মহসিন রোডে নকশা করা একটি আবাসিক ভবনসহ তাঁর বিভিন্ন আবাসিক ও ডুপ্লেক্স বাড়ির নকশার অভিজ্ঞতাও আলোচনায় উঠে আসে। ঢাকায় কাজ করার সময় KS Consultant-এর সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রকল্পে নিওক্ল্যাসিক্যাল (Neo-classical) স্থাপত্যরীতি, আধুনিক নকশার বৈশিষ্ট্যের ব্যবহার নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। ধানমন্ডির অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের নকশায় ক্ল্যাসিক্যাল স্থাপত্যরীতির প্রয়োগও ছিল আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিল্পকারখানার নকশা প্রসঙ্গে মাহিন গ্রুপের একটি প্রকল্পের উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখান, কীভাবে ইটের মতো স্থানীয় নির্মাণসামগ্রী এবং নিওক্ল্যাসিক্যাল স্থাপত্যরীতির ব্যবহার একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকেও স্বতন্ত্র নান্দনিকতা ও পরিচয় দিতে পারে। |
|
সেমিনারে মডারেটর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফেলো স্থপতি অধ্যাপক আলী নকী। তিনি প্রধান আলোচকের বক্তব্যের ওপর নিজের মতামত তুলে ধরেন এবং পেশাগত ও শিক্ষকতা জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। স্থপতি প্রিন্সের মতে, স্থাপত্য শুধু একটি পেশা নয়; এটি চিন্তা, অনুভূতি ও সৃজনশীলতার প্রকাশ। আন্তর্জাতিক স্থপতিদের কাজ থেকে শেখা, নিজের নকশার ভাষা তৈরি করা এবং পেশাগত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ভালো কাজের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি তরুণ স্থপতিদের পরামর্শ দেন। শিক্ষকতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, স্থাপত্যশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের শুধু নকশা শেখানোই যথেষ্ট নয়; কাজের আনন্দ অনুভব করা, স্থাপত্যকে উপভোগ করা এবং নতুন কিছু খুঁজে দেখার আগ্রহ তৈরি করাও জরুরি। |
|
স্থাপত্যের ব্যবহারিক দিকের পাশাপাশি এর চিন্তা, দর্শন ও সৃজনশীলতা নিয়ে বাস্থইয়ের এই উদ্যোগ শিক্ষার্থী ও তরুণ স্থপতিদের জন্য জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে। স্থাপত্যকে নতুনভাবে ভাবতে এবং নিজেদের কাজে আরও মনোযোগী হতে তাঁদের অনুপ্রাণিত করার মধ্য দিয়ে সেমিনারটি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। |
| প্রতিবেদকঃ স্থপতি মুনিয়া আহমদে মিম। |