|
কমনওয়েলথ এসোসিয়েশন অফ আর্কিটেক্টস (CAA) আয়োজিত CAA এওয়ার্ড ২০২৬-এ বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি স্থাপত্য আন্তর্জাতিক পরিসরে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে অনুষ্ঠিত CAA সাধারণ অধিবেশনে এবারের পুরস্কার প্রদান করা হয়। পেশাগত চর্চার পাশাপাশি বাংলাদেশের স্থাপত্য শিক্ষার্থীদের কাজও এবারের CAA এওয়ার্ড-এ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। এবারের পুরস্কার কর্মসূচিতে জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, জীববৈচিত্র্যের সংকট এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো সমকালীন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় স্থাপত্যের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নকশা এবং বাস্তব সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাবকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের প্রকল্পগুলোর স্বীকৃতি শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জনের ঘটনা নয়; বরং দেশের স্থাপত্যচর্চায় পরিবেশ, সমাজ ও মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে যে বহুমাত্রিক চিন্তার বিকাশ ঘটছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। |
|
CAA এওয়ার্ড ২০২৬-এর জুরি বোর্ডের সদস্যবৃন্দ |
|
CAA এনভায়রমেন্টাল ইম্প্যাক্ট এওয়ার্ড-এর এশিয়া অঞ্চলে যৌথভাবে বিজয়ী হয়েছে বাংলাদেশের দুটি প্রকল্প। এর মধ্যে রয়েছে ‘জেবুন নেসা মসজিদ’, যার নকশা করেছে স্টুডিও মরফোজেনেসিস লিঃ, এবং ‘রূপগাঁও: এ প্যারাডাইম ফর ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট সিমবায়োটিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট’, যা পারসিভ-এর উদ্যোগ। ‘জেবুন নেসা মসজিদ’ এমন একটি প্রকল্প যা পরিবেশগত সংবেদনশীলতা, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস এবং ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রকল্পটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের পরিবেশ-সচেতন সমকালীন স্থাপত্যচর্চার প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহেরও ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, ‘রূপগাঁও কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পটি জলবায়ু-সহনশীল ও পারস্পরিক নির্ভরশীল কমিউনিটি উন্নয়নের ধারণাকে সামনে আনে। প্রকল্পটির নকশা-ভাবনায় জলবায়ু অভিযোজন, স্থানীয় সম্পদ, কমিউনিটি এবং পরিবেশের পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। |
| CAA এনভায়রমেন্টাল ইম্প্যাক্ট এওয়ার্ড-এর এশিয়া অঞ্চলে যৌথভাবে বিজয়ী — ‘জেবুন নেসা মসজিদ’- স্টুডিও মরফোজেনেসিস লিঃ |
| CAA এনভায়রমেন্টাল ইম্প্যাক্ট এওয়ার্ড-এর এশিয়া অঞ্চলে যৌথভাবে বিজয়ী — ‘রূপগাঁও: এ প্যারাডাইম ফর ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট সিমবায়োটিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট’-পারসিভ |
|
CAA সোশ্যাল ইম্প্যাক্ট এওয়ার্ড-এর এশিয়া অঞ্চলের বিজয়ী হয়েছে “রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের কমিউনিটি স্পেসেস”—যার সঙ্গে সম্পৃক্ত স্থপতিরা হলেন, খাজা ফাতমি, রিজভী হাসান এবং সাদ বিন মোস্তফা। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের মতো জটিল মানবিক পরিস্থিতিতে স্থাপত্য কীভাবে নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সামাজিক পরিসর তৈরি করতে পারে, প্রকল্পটি তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। একই বিভাগে বিজয়ী হয়েছে “নারায়ণগঞ্জ সিটি পার্ক এবং বাবুরাইল খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প”, যার সঙ্গে রয়েছে ভিত্তি স্থপতিবৃন্দ লিঃ। দীর্ঘদিনের দখল, দূষণ ও অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসা বাবুরাইল খালকে পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে প্রকল্পটি জল, জমি ও জনপরিসরের মধ্যে নতুন সম্পর্ক তৈরি করেছে। খালের তীরবর্তী হাঁটার পথ, সবুজ পরিসর, ঘাট এবং বিভিন্ন সামাজিক ব্যবহারের স্থান মিলিয়ে প্রকল্পটি একটি অবহেলিত নগর জলপথকে পুনরায় নাগরিক জীবনের অংশ করে তোলার চেষ্টা করেছে। |
| CAA সোশ্যাল ইম্প্যাক্ট এওয়ার্ড-এর এশিয়া অঞ্চলের বিজয়ী — ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের কমিউনিটি স্পেসেস’- স্থপতি- খাজা ফাতমি, রিজভী হাসান এবং সাদ বিন মোস্তফা |
| CAA সোশ্যাল ইম্প্যাক্ট এওয়ার্ড-এর এশিয়া অঞ্চলের বিজয়ী — ‘নারায়ণগঞ্জ সিটি পার্ক এবং বাবুরাইল খাল পুনরুদ্ধার প্রকল্প‘- ভিত্তি স্থপতিবৃন্দ লিঃ, |
|
সামাজিক প্রভাবের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরও চারটি প্রকল্প CAA সোশ্যাল ইম্প্যাক্ট এওয়ার্ড – Commendation অর্জন করেছে। এগুলো হলো,
এই স্বীকৃতিগুলো প্রকাশ করে, স্থাপত্যের সামাজিক ভূমিকা কেবল নান্দনিকতা কিংবা নির্মাণগত উৎকর্ষে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের মৌলিক জীবনযাপন, নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও স্থাপত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। |
| ‘আল ফালাহ জামে মসজিদ’ — DWm4 আর্কিটেক্টস |
| ‘মেঘ-রোদ’ — ফ্রেমওয়ার্ক |
| ‘১০০ হোমস ফর মার্জিনালাইজড রুরাল কমিউনিটি’ — বাংলাদেশ স্থপতি ইন্সটিটিউট |
| ‘পুলিশ ক্যাফে, সিরাজগঞ্জ’ — বেঙ্গল স্থপতি |
|
CAA প্রেসিডেন্টস এওয়ার্ড-এর এশিয়া অঞ্চলে আঞ্চলিক বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর শিক্ষার্থী সাকিব নাসির খান, তাঁর প্রকল্প ‘ইন ট্রানজিশন: অ্যাডাপটিভ টি-শেল্টারস ফর ডেন্স আরবান কমিউনিটি রিকভারি’-এর জন্য। প্রকল্পটি ঘনবসতিপূর্ণ নগর পরিবেশে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের জন্য অভিযোজনযোগ্য অস্থায়ী আশ্রয়ব্যবস্থার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করে। একই বিভাগে Commendation পেয়েছেন আরও দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আশরাফুজ জামান-এর ‘দ্য থার্ড শোর: রিকানেক্টিং রিভার, সিটি, অ্যান্ড কালেক্টিভ মেমোরি অ্যাট বরিশাল ওয়াটারফ্রন্ট’ এবং বুয়েট-এর নাফিজা নাওয়ার সুবহা-এর ‘ইকো-হোমস: এনহ্যান্সিং দ্য আরবান পুওর অব সাততলা, ঢাকা’ প্রকল্প দুটি এই স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এই প্রকল্পগুলোতে নদী ও নগরের সম্পর্ক, সমষ্টিগত স্মৃতি, জলবায়ু ও নগরবাসের বাস্তবতা এবং নিম্নআয়ের মানুষের আবাসনের মতো বাংলাদেশের সমকালীন নগর ও সামাজিক বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উঠে এসেছে। |
|
CAA প্রেসিডেন্টস এওয়ার্ড-এর এশিয়া অঞ্চলে আঞ্চলিক বিজয়ী |
CAA প্রেসিডেন্টস এওয়ার্ড-এর Commendations |
|
২০২৬ সালের CAA এওয়ার্ডস-এ বাংলাদেশের এই ধারাবাহিক স্বীকৃতি দেশের স্থাপত্যচর্চার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল স্থাপত্য থেকে শুরু করে মানবিক সংকট মোকাবিলা, নগর জলপথ পুনরুদ্ধার, জনপরিসর উন্নয়ন এবং প্রান্তিক মানুষের আবাসন বিভিন্ন ক্ষেত্রের কাজ একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চার বৈচিত্র্য ও প্রাসঙ্গিকতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। স্থাপত্যের এই বহুমাত্রিক প্রয়োগ দেখিয়ে দেয়, স্থানীয় বাস্তবতা ও সামাজিক প্রয়োজন থেকে উঠে আসা নকশা-ভাবনাও আন্তর্জাতিক স্থাপত্য আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, আবাসন সংকট ও সামাজিক বৈষম্যের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের সময়ে বাংলাদেশের স্থপতি ও শিক্ষার্থীদের কাজ সেই বৃহত্তর আলোচনায় নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করছে। CAA এওয়ার্ডস-এ স্বীকৃত বাংলাদেশের সকল স্থপতি, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীকে স্থাপত্য ও নির্মাণের পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন। |
| প্রতিবেদকঃ স্থপতি মুনিয়া আহমেদ মিম। |