স্মৃতি, স্থান ও পুনর্জাগরণ: কুমিল্লা টাউন হল কমপ্লেক্স পুনরুদ্ধার

স্থাপত্য ও নির্মাণ
শিক্ষার্থীদের প্রকল্প
২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
স্মৃতি, স্থান ও পুনর্জাগরণ: কুমিল্লা টাউন হল কমপ্লেক্স পুনরুদ্ধার

প্রকল্পের শিরোনাম: স্মৃতি, স্থান ও পুনর্জাগরণ: কুমিল্লা টাউন হল কমপ্লেক্স পুনরুদ্ধার

সাইটের অবস্থান: কুমিল্লা টাউন হল, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা, বাংলাদেশ

শিক্ষার্থীর নাম: মোঃ তাসলিমুল বারী

শিক্ষাবর্ষ: ২০২৫

প্রকল্প তত্ত্বাবধায়ক: স্থপতি আফরা আনান সাবা

বিভাগীয় প্রধান: স্থপতি ড. মোঃ নওরোজ ফাতেমি

বিশ্ববিদ্যালয়: ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিক

2.md. Taslimul Bariমোঃ তাসলিমুল বারী

প্রকল্প পরিচিতি

১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা টাউন হল কমপ্লেক্সটি ৩.২ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত একটি ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যবাহী স্থান, যা বর্তমানে নগরায়ন ও অযত্নের কারণে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সময়ের সাথে সাথে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবহেলা এবং পরিবর্তিত শহুরে চাহিদার ফলে ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ এই স্থাপনাগুলো আজ খন্ডিত, অব্যবহৃত এবং ঝুঁকির মুখে পড়েছে

1.1 Current Conditionসাইটের বর্তমান অবস্থা

এই প্রকল্পটি স্থাপনাগুলো ভেঙে ফেলার সংস্কৃতির বিরোধিতা করে একটি সংবেদনশীল 'অ্যাডাপ্টিভ রিইউজ' বা অভিযোজিত পুনঃব্যবহারের কৌশল প্রস্তাব করে, যা বীরচন্দ্র লাইব্রেরি, টাউন হল এবং অন্যান্য ক্লাব ভবনগুলোকে আধুনিক নাগরিক জীবনের সাথে পুনরায় একীভূত করবে। সংরক্ষণ এবং কৌশলগত পুনঃউন্নয়নের সমন্বয়ে নকশাটি এই স্থবির ধ্বংসাবশেষকে একটি প্রাণবন্ত শহুরে কেন্দ্রে রূপান্তরিত করে। এটি 'ময়দান' বা উন্মুক্ত প্রাঙ্গণটিকে একটি গণতান্ত্রিক প্লাজা হিসেবে পুনরুদ্ধার করে, যা বর্তমান ও ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি এই স্থানটিকে সামষ্টিক স্মৃতির ধারক হিসেবে টিকিয়ে রাখবে।

প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ

১৮৮৫ সালে মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কুমিল্লা টাউন হল একসময় এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তবে দ্রুত নগরায়ণ এবং প্রশাসনিক অবহেলার কারণে ৩.২ একরের এই ঐতিহাসিক স্থানটি আজ খন্ডিত ও শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। এখানকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো ক্ষয়িষ্ণু, মূল 'ময়দান' বা প্রাঙ্গণটি অবৈধ বাজারের দখলে এবং মিনিস্টেরিয়াল ও থিওসফিক্যাল ক্লাব ভবনগুলো বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। এই প্রকল্পের মূল চ্যালেঞ্জ ছিল এমন একটি স্থানে নকশা প্রণয়ন করা যেখানে প্রচুর 'অস্পৃশ্য স্মৃতি' জড়িয়ে আছে, যার মাধ্যমে স্থানটিকে একটি প্রাণহীন জাদুঘর হিসেবে স্থবির করে না রেখে আধুনিক জীবনের উপযোগী করে তোলা।

 

1.2 Site Locationসাইট লোকেশন

 

1.4 Mappingম্যাপিং

 

1.7 Site Handling Strategyসাইট হ্যান্ডেলিং স্ট্র্যাটেজি

সাংস্কৃতিক ম্যাপিং

শুধুমাত্র টাউন হল কমপ্লেক্স নয়, বরং এর সংলগ্ন শহুরে কাঠামোর ওপর একটি বিস্তারিত সাংস্কৃতিক ম্যাপিং পরিচালনা করা হয়েছে যাতে কুমিল্লার নাগরিক পরিচায়ক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোকে চিহ্নিত করা যায়। ঔপনিবেশিক স্থাপনা, নাগরিক স্মৃতিস্তম্ভ এবং স্থানীয় জনরীতির মধ্যকার সম্পর্ক অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই গবেষণা একটি সুসংহত 'হেরিটেজ ট্রেইল' বা ঐতিহ্যের পথরেখা তৈরি করেছে, যা টাউন হলকে এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের সাথে সংযুক্ত করে। নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই পথরেখাকে ব্যবহার করা হয়েছে বিচ্ছিন্ন উপাদানগুলোকে ভৌত ও দৃশ্যমানভাবে পুনরায় গেঁথে তোলার জন্য। এটি নিশ্চিত করে যে উপাদানগুলো কেবল টিকে থাকবে না, বরং সক্রিয়ভাবে উদযাপিত হবে, যার ফলে শহরের সমৃদ্ধ ইতিহাস স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটক উভয়ের কাছেই সুস্পষ্ট ও সহজবোধ্য হয়ে উঠবে।

1.3 Cultural Trailসাংস্কৃতিক ম্যাপিং

স্থানিক ও আচরণগত ম্যাপিং

স্মৃতি অঞ্চল: লাইব্রেরি এবং টাউন হল এখনও কুমিল্লার প্রবীণ প্রজন্মের কাছে আবেগীয়ভাবে সংযুক্ত, যারা এখানে বই পাঠ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা জনসভায় অংশ নেওয়ার স্মৃতি বহন করেন।

বিচ্ছিন্ন সংযোগ: টাউন হল এবং ক্লাব অঞ্চলগুলোর মধ্যকার আদি সম্পর্কটি বর্তমানে অস্থায়ী দোকান এবং সীমানা প্রাচীরের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

উৎসবকালীন ব্যবহার: ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ এবং ১৬ই ডিসেম্বরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে এখানে প্রচুর মানুষের সমাগম ঘটে, বিশেষ করে শহীদ মিনার এবং অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গণে।

দৈনন্দিন ব্যবহার: সামনের চত্বরটি বর্তমানে হকারদের একটি আধা-স্থায়ী বাজারে পরিণত হয়েছে যেখানে পোশাক, বই এবং খাবার পাওয়া যায় । এটি একদিকে যেমন প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করে, অন্যদিকে যানজট ও বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি করে ।

স্থাপত্যিক জরাজীর্ণতা সত্ত্বেও, এই স্থানটি আজও কুমিল্লার মানুষের সামষ্টিক স্মৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ঐতিহ্য ও আধুনিক জীবনযাত্রার একটি সক্রিয় মিলনস্থল হিসেবে টিকে আছে। এই বিশ্লেষণটি নিশ্চিত করে যে, শুধু সংরক্ষণই যথেষ্ট নয়; বরং নকশা কৌশল এমন হতে হবে যা এই সাংস্কৃতিক প্রবাহগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করবে এবং স্থানের মর্যাদা বজায় রেখে জনচাহিদা ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতার সমন্বয় ঘটাবে।

নকশা কৌশল

মাস্টারপ্ল্যানটিতে পুরো কমপ্লেক্সকে চারটি কৌশলগত অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে, যেখানে সংরক্ষণ, সংস্কার এবং স্থানান্তরের একটি সুচিন্তিত সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি মূলত 'সাইট হ্যান্ডলিং স্ট্র্যাটেজি' বা সাইট ব্যবস্থাপনার মূল পরিকল্পনা থেকে নেওয়া হয়েছে।

1.5 Initial Design Decision 1প্রাথমিক ডিজাইন পরিকল্পনা - ১

1.5 Initial Design Decision 2প্রাথমিক ডিজাইন পরিকল্পনা - ১

 

1.10 Initial Sketches 1 (1)প্রাথমিক স্কেচ

1.10 Initial Sketches 1 (2)প্রাথমিক স্কেচ

1.10 Initial Sketches 1 (3)প্রাথমিক স্কেচ

1.10 Initial Sketches 1 (4)প্রাথমিক স্কেচ

Ground Floor Plan With Legendsমাস্টারপ্ল্যান

2.1 All Floor Plansঅন্যান্য ফ্লোর প্ল্যান

জোন এ: বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও টাউন হল: এখানে আদি ঔপনিবেশিক অবয়ব বা স্কাইলাইন অক্ষুণ্ন রাখার জন্য কঠোরভাবে 'সংরক্ষণ' পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। এর অভ্যন্তরীণ অংশকে আধুনিক শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং আলোকসজ্জার মাধ্যমে একটি কার্যকর থিয়েটার ও ডিজিটাল আর্কাইভে রূপান্তরিত করা হয়েছে, যাতে স্থাপনাটি কেবল একটি নিথর স্মৃতি না হয়ে সচল থাকে।

1.8 Redesigned Birchandra Libraryপুনঃ নকশাকৃত বীরচন্দ্র লাইব্রেরী

2.3 Redesigned Library Schematic Sectionপুনঃ নকশাকৃত বীরচন্দ্র লাইব্রেরী (স্কিমেটিক ছেদচিত্র)

জোন বি: অডিটোরিয়াম ও কুমিল্লা ক্লাব: নাগরিক প্রয়োজনে বাড়তি উন্মুক্ত স্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে অডিটোরিয়ামের আয়তনটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নির্ধারণ করা হয়েছে। অডিটোরিয়ামের মূল অংশটি আংশিক ভূগর্ভস্থ করার মাধ্যমে দৃশ্যমান বাধা কমানো হয়েছে, যা ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোকে স্বকীয়তায় উজ্জ্বল থাকতে সাহায্য করে।

 

1.9 Redesigned Auditorium & Cumilla Clubপুনঃ নকশাকৃত অডিটোরিয়াম এবং কুমিল্লা ক্লাব

জোন সি: সিভিক ফিলোসফি সেন্টার: জরাজীর্ণ থিওসফিক্যাল সোসাইটি এবং মিনিস্টেরিয়াল অফিসার্স ক্লাব ভবনগুলোকে একটি 'নাগরিক দর্শন কেন্দ্র' হিসেবে পুনরায় কল্পনা করা হয়েছে। এই খ কক্ষগুলোকে একত্রিত করে একটি হেরিটেজ ডায়ালগ রুম এবং আর্কাইভ তৈরি করা হয়েছে, যা একটি ছায়াযুক্ত প্রশস্ত বারান্দা বা 'কলোনেড'-এর মাধ্যমে মূল কমপ্লেক্সের সাথে যুক্ত।

জোন ডি: পাবলিক প্লাজা: প্রবেশপথের বিশৃঙ্খলা দূর করতে হকারদের জন্য একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় চত্বরটি জনসাধারণের সমাবেশের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। শহীদ মিনারটিকে একটি শান্ত ও চিন্তাশীল বাগান সংলগ্ন এলাকায় স্থানান্তরিত করা হয়েছে, যা স্মারকটির গাম্ভীর্য ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার করে।

1.6 Site Sectionসাইটের ছেদচিত্র

2.2 Section Aa ছেদচিত্র AA

2.5 Sequential Experienceক্রমানুযায়ী অভিজ্ঞতা

উপসংহার

এই প্রকল্পটি এই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করে যে, বাংলাদেশে ঐতিহ্য সংরক্ষণ কেবল নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয় । এটি প্রমাণ করে যে, ১৩৫ বছরের পুরনো স্থাপনাগুলোও 'অ্যাডাপ্টিভ রিইউজ'-এর মাধ্যমে আধুনিক চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। কুমিল্লা টাউন হলের মূল সত্তাকে অক্ষুণ্ন রেখে এর জনপরিসরকে নতুনভাবে সাজানোর মাধ্যমে এই প্রকল্পটি আমাদের ক্ষয়িষ্ণু নাগরিক ইতিহাস রক্ষার একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

জুরি মন্তব্য

চূড়ান্ত ডিফেন্সের সময় প্রকল্পটি বহিঃস্থ জুরিদের কাছ থেকে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছে। আমন্ত্রিত স্থপতিদের মন্তব্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. স্থপতি মোঃ শরীফ উদ্দিন আহমেদ (প্রিন্সিপাল আর্কিটেক্ট, স্থপতিক)

"এই প্রকল্পের শিরোনাম মেমোরি, স্পেস অ্যান্ড রিভাইভাল' - আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে। তুমি সফলভাবে এই স্থানের স্মৃতি নিয়ে কাজ করেছ, প্রয়োজনীয় স্পেস ডিজাইন করেছ এবং পুরো কমপ্লেক্সটিকে পুনরুজ্জীবিত করেছ। তোমার এই হস্তক্ষেপ কেবল দৃশ্যমান কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং নকশা ও উপস্থাপনার মাধ্যমে তুমি এই স্থানের সাথে মিশে থাকা অস্পৃশ্য ঐতিহাসিক স্মৃতিগুলোকেও ফুটিয়ে তুলেছ। এছাড়া, উন্মুক্ত প্রাঙ্গণটিকে সুনির্দিষ্টভাবে 'ময়দান' হিসেবে চিহ্নিত করে এর স্থাপত্যিক গুরুত্ব প্রদানের মাধ্যমে তুমি এই সাইটের নাগরিক মূল্যকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছ। সামগ্রিকভাবে তোমার সিদ্ধান্তগুলো অত্যন্ত প্রশংসনীয়।"

২. স্থপতি এ কে এম তানভীর হাসান নিরু (স্থপতি পার্টনার, সিন্থেসিস আর্কিটেক্টস)

"তুমি বৃহত্তর কুমিল্লার সাংস্কৃতিক সত্তাকে অনুধাবন করেছ এবং সফলভাবে তা তোমার নকশায় অন্তর্ভুক্ত করেছ। প্রতিটি স্পেসের প্রকৃতি অনুযায়ী তুমি সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছ। বিশেষ করে পুরো প্রজেক্টটিকে একটি 'কলোনেড' বা স্তম্ভবিশিষ্ট পথরেখা দিয়ে এক সুতায় গাঁথা এবং হাঁটার পথের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বোঝাতে ভিন্ন ভিন্ন টেক্সচার বা বুনটের ব্যবহার আমার খুব ভালো লেগেছে। একজন ব্যবহারকারী হিসেবে আমি এই প্রজেক্টে সময় কাটাতে পছন্দ করব।"

2.6 Modelপ্রকল্পের মডেল 


প্রতিবেদক: স্থপতি ফাইজা ফাইরুজ

আপনার মতামত দিন

কমেন্ট

Logo
Logo
© 2026 Copyrights by Sthapattya o Nirman. All Rights Reserved. Developed by Deshi Inc.