সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা: সিলেট বিভাগীয় জাদুঘরের মাধ্যমে আত্মপরিচয়ের নবমূল্যায়ন

স্থাপত্য ও নির্মাণ
শিক্ষার্থীদের প্রকল্প
২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা: সিলেট বিভাগীয় জাদুঘরের মাধ্যমে আত্মপরিচয়ের নবমূল্যায়ন

প্রকল্পের বিবরণ:

প্রকল্পের নাম: কালচারাল কন্টিনিউয়াম (সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা)

শিক্ষার্থীর নাম: মেহজাবিন শাহেদী প্রিয়ন্তী

শিক্ষাবর্ষ: ২০২৫

তত্ত্বাবধায়ক: স্থপতি জিয়াউল ইসলাম, স্থপতি মেহরাব ইফতেখার, স্থপতি ড. আবু সাঈদ মোস্তাক আহমেদ

বিভাগীয় প্রধান: স্থপতি ড. নওরোজ ফাতেমি

বিশ্ববিদ্যালয়: ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিক

20250830 221753.jpgমেহজাবিন শাহেদী প্রিয়ন্তী

প্রকল্পের পটভূমি: সিলেট বিভাগীয় জাদুঘর একটি মাইলফলক সরকারি উদ্যোগ, যা এই অঞ্চলের অনন্য আধ্যাত্মিকতা, লোকজ সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের একটি গবেষণা-কেন্দ্রিক ভান্ডার হিসেবে কাজ করার জন্য পরিকল্পিত। এই প্রকল্পটি সিলেটের বৈচিত্র্যময় ভূ-প্রকৃতি, যেমন: ঢেউখেলানো টিলা, বিস্তীর্ণ হাওর, প্রবহমান নদী এবং জলাবনকে সরাসরি স্থাপত্য শৈলীর মাধ্যমে তুলে ধরেছে, যাতে একটি নিমগ্ন বা বাস্তবধর্মী পরিবেশ তৈরি হয়।

Location of Siteসাইট এনালাইসিস

প্রথাগত কিউরেশনের বাইরেও, এই জাদুঘরটি একটি প্রাণবন্ত কমিউনিটি হাব বা সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। এতে রয়েছে মিথস্ক্রিয়ামূলক (interactive) স্থান এবং গবেষণা শাখা, যা স্থানীয়দের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করবে এবং এ অঞ্চলের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আধ্যাত্মিক ও মরমী ঐতিহ্যকে উদযাপন করবে। পরিবেশগত সংবেদনশীলতা, ভূমিকম্প-প্রতিরোধী প্রযুক্তি এবং নৃতাত্ত্বিক সংরক্ষণের সমন্বয় ঘটিয়ে এই জাদুঘরটি নিশ্চিত করে যে, সিলেটের স্বতন্ত্র পরিচয় যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি গতিশীল এবং সহজলভ্য উত্তরাধিকার হিসেবে টিকে থাকে।

প্রেক্ষাপট ও যৌক্তিকতা: সিলেট এমন একটি অঞ্চল যা তার স্বতন্ত্র ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, যেমন: ঢেউখেলানো পাহাড় (টিলা), বিশাল জলাভূমি (হাওর) এবং আধ্যাত্মিক আন্দোলন ও চা শিল্পের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এক সমৃদ্ধ ইতিহাসের জন্য পরিচিত। এই প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও, এই অঞ্চলের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য ঐতিহ্যগুলো নথিবদ্ধ করার জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে। কুমারগাঁওয়ে প্রস্তাবিত 'সিলেট বিভাগীয় জাদুঘর' এই অভাব পূরণ করতে চায়। সিলেট শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত এই স্থানটি তার সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা এবং ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে নির্বাচিত হয়েছে।

 

Baton Houseব্যাটন হাউস

Historical Diagramহিস্টোরিক্যাল ডায়াগ্রাম

Identity Diagramআইডেন্টিটি ডায়াগ্রাম

Land Scape Diagramjpgল্যান্ডস্কেপ ডায়াগ্রাম

Materialম্যাটেরিয়াল

Program Diagramপ্রোগ্রাম ডায়াগ্রাম

মূল ধারণা: সিলেট বিভাগীয় জাদুঘর ভূমি, পানি এবং স্থাপত্য কাঠামোর এক অনন্য মেলবন্ধনের মাধ্যমে এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নতুনভাবে উপস্থাপন করে। কুমারগাঁওয়ে অবস্থিত এই নকশাটিতে ভূ-প্রকৃতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে; যার ফলে গ্যালারিগুলোকে মাটির নিচে স্থাপন করা হয়েছে যাতে বিদ্যমান ঢেউখেলানো উঁচু-নিচু টিলাগুলো অক্ষুণ্ন থাকে। মাটির উপরে ছোট ছোট প্যাভিলিয়নের মতো কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যার ত্রিভুজাকার ছাদগুলো ঐতিহ্যবাহী ‘বাংলা বাটন’ শৈলী থেকে অনুপ্রাণিত।

123

স্থাপত্য কাঠামো: স্থাপত্য হিসেবে ল্যান্ডস্কেপ প্রকল্পটির মূল নকশা-দর্শন প্রচলিত ভূমি ভরাট করার পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ জানায়, যা স্থানীয় বাস্তুসংস্থান বা ইকোলজিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর পরিবর্তে, জাদুঘরটি "ল্যান্ডস্কেপ ফার্স্ট" বা প্রকৃতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। প্রদর্শনীর অধিকাংশ অংশই মাটির নিচে স্থাপন করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জন করে: প্রথমত, এটি সাইটের প্রাকৃতিক উঁচু-নিচু ভূখণ্ডকে রক্ষা করে, যার ফলে ল্যান্ডস্কেপটিই প্রধান দৃশ্যমান উপাদান হিসেবে বজায় থাকে; এবং দ্বিতীয়ত, এটি একটি তাপীয়ভাবে স্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ প্রদান করে, যা সংবেদনশীল প্রত্নবস্তু সংরক্ষণের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

Site Existing Treeসাইটের এক্সিস্টিং গাছগাছালি

Site Sectionসাইটের ছেদচিত্র

Tree 1গাছ - ১

Tree 2গাছ - ২

Tree 3গাছ - ৩

Tree Diagramগাছের ডায়াগ্রাম

Masterplanমাস্টারপ্ল্যান

স্থাপত্য রূপ ও উপকরণের ব্যবহার: যদিও গ্যালারিগুলো ভূগর্ভস্থ, মাটির উপরে দৃশ্যমান স্থাপত্য কাঠামোসমূহ হালকা ওজনের 'প্যাভিলিয়ন' হিসেবে নকশা করা হয়েছে, যা এই স্থানের জলপ্রবাহ বা হাইড্রোলজিকে বাধাগ্রস্ত করে না। এর ছাদের কাঠামোতে একটি আধুনিক ত্রিভুজাকার সিস্টেম ব্যবহার করা হয়েছে, যা ঐতিহ্যবাহী ‘বাংলা বাটন’ ঘরের ছাদরীতির একটি সমসাময়িক রূপ। এটি এই ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে কাঠামোগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকল্পটিকে একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক পরিচয় প্রদান করে।

স্থায়িত্ব এবং জল-বাস্তুসংস্থান:

এখানে পানিকে কেবল প্রয়োজনীয় উপযোগ হিসেবে নয়, বরং একটি প্রদর্শনীর বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সিলেট বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ এবং জলাভূমি সমৃদ্ধ অঞ্চল - এই সত্যকে মাথায় রেখে নকশাটিতে বর্ষাচক্রকে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতার সাথে যুক্ত করা হয়েছে। সুনিপুণভাবে তৈরি ছাদের ঢালের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করা হয় এবং তা জলচক্রের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় জলাধারগুলোতে প্রবাহিত হয়। এটি প্রবল বৃষ্টিপাতকে কেবল একটি আবহাওয়াগত ঘটনা থেকে একটি সংবেদনশীল স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যে রূপান্তর করে, যা বর্ষাকালে এবং শুষ্ক মৌসুমেও জাদুঘরটিকে একটি "জীবন্ত জলপ্রপাত"-এ পরিণত করে।

Basement 1 and 2 With Legendবেসমেন্ট প্ল্যান ১ এবং ২

Basement 3 With Legendবেসমেন্ট প্ল্যান ৩

Se C2ছেদচিত্র ১

Se C1ছেদচিত্র ২

নাগরিক অংশগ্রহণ:

অভিজাত ও চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন জাদুঘর মডেল থেকে সরে এসে এই নকশাটি জনসাধারণের প্রবেশযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়। ভূমির সমতল অংশটিকে উন্মুক্ত প্লাজা, হাঁটার পথ এবং জলাধারের পাড় হিসেবে উৎসর্গ করা হয়েছে, যা সামাজিক মিথস্ক্রিয়াকে উৎসাহিত করে। মাটির ইতিহাস এবং মানুষের ইতিহাসকে একসূত্রে গেঁথে সিলেট বিভাগীয় জাদুঘর সংস্কৃতি, জলবায়ু এবং স্মৃতির এক নিরবচ্ছিন্নতার প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।

 

Axono Master Planএক্সোনোমেট্রিক প্ল্যান

জুরি মন্তব্য:

স্থপতি আসিফ এম. আহসানুল হক: পারিপার্শ্বিকতার সাথে প্রতিযোগিতা করার পরিবর্তে, এই প্রকল্পটি অত্যন্ত সচেতনভাবে নিজেকে সংযত রেখেছে। প্রকৃতিকে নকশার নেতৃত্বে রাখার মাধ্যমে স্থাপত্য কাঠামোটি এর উদ্দেশ্যের একটি সূক্ষ্ম বাহক হয়ে উঠেছে। এই পদ্ধতিটি পরিবেশকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কার্যক্রমগুলোকে সুন্দরভাবে সমন্বয় করেছে।

 Scene 1
Scene 5 

স্থপতি দেওয়ান আরিফ: এই প্রকল্পের সূচনা একটি দূরদর্শী ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে কাজ করে, যা স্বপ্ন এবং বাস্তবায়নের ব্যবধান ঘোচাতে ভূগর্ভস্থ স্থাপত্যে গভীর দক্ষতার দাবি রাখে। মাটির গভীরে দৃষ্টি দিয়ে নকশাটি জটিল কার্যকারিতার সাথে প্রযুক্তিগত নিখুঁততার সামঞ্জস্য করেছে, যা উচ্চ-ভূমিকম্প প্রবণ এই অঞ্চলে কাঠামোগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। এই শান্ত গভীরতাতেই প্রকল্পের প্রকৃত সম্ভাবনা ফুটে উঠেছে, যেখানে স্থাপত্য নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে যাতে ভূ-প্রকৃতিই প্রধান প্রদর্শনী হয়ে উঠতে পারে।

স্থপতি তাওরেম রাহুল সিংহ: স্থাপত্যকে মাটির নিচে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি পৃথিবীর প্রতি একটি নীরব শ্রদ্ধা। এই উচ্চ-ভূমিকম্প প্রবণ অঞ্চলে, ভূগর্ভস্থ কাঠামো একটি সুদৃঢ় স্থিতিশীলতা দেয়। ছাদের কাঠামোটি ভাসমান না রেখে ভূমির ঢালের সাথে মিলিয়ে রাখা উচিত, কারণ তা প্রকল্পের চরিত্রের সাথে একাত্ম হয়ে যাবে।

 Scene 4
135

প্রতিবেদক: স্থপতি ফাইজা ফাইরুজ

আপনার মতামত দিন

কমেন্ট

Logo
Logo
© 2026 Copyrights by Sthapattya o Nirman. All Rights Reserved. Developed by Deshi Inc.