|
প্রকল্পের নাম: ‘পিছুডাক’ প্রকল্পের সাইট: প্রকল্পটি কুষ্টিয়া জেলার মিনা পাড়ায় অবস্থিত। ক্লায়েন্ট: মোঃ হালিমুজ্জামান মোট নির্মিত এলাকা: ২২,৯০০ বর্গফুট প্রকল্প সমাপ্তির সময়: ২০২৪ স্থপতি/ডিজাইন টিম: স্থপতি মোঃ শাহরিয়ার হাসান, স্থপতি রওনক উল জিসান, স্থপতি এ. কে. এম. শামসুল আরিফিন, স্থপতি মোঃ মিঠুন আলী, স্থপতি ফারজানা ইসলাম। ফটোগ্রাফার: DWA, মারুফ রায়হান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবনা থেকে অনুপ্রাণিত -“যেখানে আকাশ নেমে আসে উঠোনে, সেখানেই ঘর গান শেখে” এই বাড়িটি যেন ধীরে ধীরে এক শান্ত নিশ্বাসের মতো চারপাশ ছুঁয়ে গেছে। বাড়িটির ডিজাইন আধুনিক, কিন্তু এর শিকড় গাঁথা আছে গ্রামবাংলার শান্ত-নির্মল স্মৃতিতে। এটি শুধু একটি স্থাপত্য নয়, বরং শেকড়ের টানে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ - পরিবারকে তাদের শেকড়ের কাছে, দাদিমার কাছে, আর সেই মাটির কাছে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, যেখানে তাদের শৈশবের প্রথম পদচিহ্ন রয়ে গেছে। যেন তারা কর্তব্যবোধ থেকে নয়, ভালোবাসার টানে ফিরে আসে। |
|
বাড়ির ভেতরে রয়েছে নতুনভাবে ভাবা একটি উঠোন, যেখানে ঐতিহ্য ও প্রকৃতি একসঙ্গে মিশে গেছে। একটি একাকী গাছ আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে; গাছটির চারপাশের আলো-ছায়া দিনের একেক সময়ে একেকভাবে বদলে যায়। ডাবল-হাইট খোলা অংশ দিয়ে আলো নেমে আসে আশীর্বাদের মতো, ছড়িয়ে পড়ে মার্বেল নকশার মেঝেতে। সেই নকশা মনে করিয়ে দেয় পুরোনো বাংলার বাড়িগুলোর কথা, যেখানে পাথর ও অলংকরণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গল্প বয়ে নিয়ে যেত। এই উঠোন যেন পুরোনো স্মৃতিকে নতুন করে ফিরিয়ে আনে। এর শান্ত পরিবেশ কুঠিবাড়ির নীরবতা আর লালনের সহজ-সরল জীবনদর্শনের কথা মনে করিয়ে দেয়। |
দিনের বেলায় সূর্যের আলোয় বাড়ির ভেতরের উঠোন |
সন্ধ্যাকালীন সময়ে কৃত্রিম আলোয় বাড়ির ভেতরের উঠোন |
|
গ্রাউন্ড ফ্লোরে আনুষ্ঠানিক বসার জায়গার সাথে বাইরে বসার জায়গা |
ডিজাইনের পেছনের সব ভাবনা ও পরিকল্পনাকে একসঙ্গে দেখলে, বাড়িটি শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি একটি অনুভূতির জায়গা হয়ে ওঠে। এখানে অতীত ও বর্তমান, গ্রাম ও আধুনিক জীবন, স্মৃতি ও স্বপ্ন একসঙ্গে মিশে গেছে। এটি গ্রামীণ জীবনের সহজতা, আধুনিক ডিজাইনের আত্মবিশ্বাস এবং কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গভীর ছোঁয়া বহন করে। এর নীরবতার মধ্যে বাড়িটি তার প্রতিশ্রুতি রাখে - উষ্ণতা দেওয়া, আলো দেওয়া, আর পরিচিত অনুভূতি ফিরিয়ে দেওয়া, যেন দরজার সামনে বসে থাকা এক দাদিমার মতো, শান্তভাবে অপেক্ষা করে থাকে। |
|
প্রকল্পের বিবরণ ‘পিছু ডাক’ একটি তিনতলা একক পরিবারের আবাসিক ইন্টেরিয়র প্রকল্প। এর মোট আয়তন প্রায় ২২,৯০০ বর্গফুট। এটি এমন একটি বাড়ি, যা মানুষকে তাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয় এবং পারিবারিক জীবন ও সামাজিক সম্পর্ককে একসঙ্গে ধারণ করে। বাড়িটির নকশা একটি কেন্দ্রীয় উঠানকে ঘিরে গড়ে উঠেছে, ফলে ঘরের বিভিন্ন অংশে সহজেই প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস পৌঁছে যায় এবং বাড়ির এক অংশ থেকে অন্য অংশ সহজে দেখা যায়। |
|
এই বাড়ির উঠোনকে ঘিরে কক্ষগুলো সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। পর্দাগুলো হালকা বাতাসে দুলতে থাকে, মেঝেতে দিনের আলোর পরিবর্তনশীল ছায়া-প্রতিফলন দেখা যায়, আর খোলা পথ দিয়ে গ্রামবাংলার পরিচিত বাতাস ভেসে আসে।এক কোণে রয়েছে একটি ছোট লাইব্রেরি ও বসার জায়গা। ওপরে খোলা আকাশ থেকে আলো এসে সেখানে পড়ে, যা চিন্তা করা ও শান্তভাবে থাকার জন্য একটি আরামদায়ক জায়গা তৈরি করে। এটি যেন আধুনিক সময়ের একটি আখড়াবাড়ি, যেখানে কিছুটা নীরবতা ও একান্ত সময় খুঁজে পাওয়া যায়। সন্ধ্যা নামলে বাড়ির পরিবেশ বদলে যায়। ছাদের বারবিকিউ টেরাসে ছোট ছোট আলোর বিন্দু জ্বলে ওঠে, যা রাতের তারাভরা আকাশের অনুভূতি এনে দেয়। সেখানে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া, আর একসঙ্গে খাবার উপভোগ করার সুন্দর পরিবেশ তৈরি হয়। নিচতলার পারিবারিক বসার ঘরে টেরাকোটার উষ্ণ রং ব্যবহার করা হয়েছে, যা বাংলা স্থাপত্যের মাটির সঙ্গে যুক্ত সহজ ও স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে স্মরণ করে। |
ছাদের বারবিকিউ টেরাস
|
|
গ্রাউন্ড ফ্লোর প্ল্যান |
ফার্স্ট ফ্লোর প্ল্যান |
|
সেকেন্ড ফ্লোর প্ল্যান |
থার্ড ফ্লোর প্ল্যান |
|
গ্রাউন্ড ফ্লোরটি এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে এটি পরিবার ও আশপাশের মানুষের মধ্যে একটি সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করে। এই তলায় রয়েছে অতিথি আপ্যায়নের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক বসার ঘর, একটি প্রশস্ত ডাইনিং স্পেস এবং তার সঙ্গে সংযুক্ত প্রয়োজনীয় সব সুবিধাসহ একটি আলাদা রান্নাঘর। এছাড়াও পরিবারের সদস্যদের দৈনন্দিন আড্ডা ও সময় কাটানোর জন্য একটি ফ্যামিলি লিভিং স্পেস রাখা হয়েছে। এই ফ্লোরে দুটি শয়নকক্ষ রাখা হয়েছে, যার প্রতিটির সঙ্গে টয়লেট সংযুক্ত। এর মধ্যে একটি পরিবারের বয়স্ক সদস্যের সুবিধা ও স্বাচ্ছন্দ্যের কথা বিবেচনা করে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এছাড়া পরিবার ও অতিথিদের ব্যবহারের জন্য একটি ছোট টয়লেট রাখা হয়েছে। |
|
ফার্স্ট ফ্লোরটি কিছুটা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে। এখানে একটি লাউঞ্জ রয়েছে, যা সামনের দিকে খোলা টেরাসের সঙ্গে যুক্ত। দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য একটি ছোট ডাইনিং স্পেসের সঙ্গে একটি ড্রাই কিচেন রাখা হয়েছে। এই ফ্লোরে সংযুক্ত বাথরুমসহ তিনটি অতিথি শয়নকক্ষ রয়েছে, যার প্রতিটির সঙ্গে টয়লেট সংযুক্ত। পাশাপাশি একটি গেস্ট টয়লেট এবং একটি সার্ভেন্টস রুমও রয়েছে টয়লেটসহ, যা বাসার গোপনীয়তা ও ব্যবহারিক সুবিধা নিশ্চিত করে। |
|
সেকেন্ড ফ্লোরটি আরও ব্যক্তিগত পারিবারিক জোন হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এখানে তিনটি শয়নকক্ষ রয়েছে, যার প্রতিটির সঙ্গে টয়লেট এবং নিজস্ব বারান্দা আছে। এছাড়াও একটি পারিবারিক লিভিং স্পেস, ড্রাই কিচেনসহ ডাইনিং এলাকা এবং একটি লাইব্রেরি রয়েছে, যা শান্তভাবে সময় কাটানোর জন্য ব্যবহার করা যায়। একটি টেরাসও রাখা হয়েছে, যা ভেতরের ও বাইরের জায়গার মধ্যে সংযোগ আরও বাড়িয়ে দেয়। থার্ড এবং বাড়িটির সর্বশেষ ফ্লোরে একটি অতিরিক্ত শয়নকক্ষ আছে, যার সঙ্গে টয়লেট সংযুক্ত রয়েছে। |
|
প্রকল্পে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর বিবরণ এই বাড়িতে ব্যবহৃত সব উপকরণই যত্ন সহকারে নির্বাচন করা হয়েছে - কাঠ, পাথর, টেরাকোটা ও কংক্রিট। সবকিছু একই রঙের টোনে রাখা হয়েছে, যাতে কোনো কিছু আলাদা না লাগে এবং পুরো বাড়ি একসঙ্গে সুন্দরভাবে মিলে যায়। বাড়ির আসবাবপত্রগুলোও খুব সহজ ও স্বাভাবিক। হাতে তৈরি এবং সময় নিয়ে তৈরি করা এই জিনিসগুলো স্থাপত্যের সৌন্দর্যকে আরও স্বাভাবিকভাবে তুলে ধরে। ডাইনিং স্পেসটি পরিবারের সকলের একত্রিত হওয়ার জায়গা, যা সন্ধ্যায় নরম আলোয় উষ্ণ হয়ে ওঠে। লাউঞ্জ স্পেসগুলো এমনভাবে উঠোনের দিকে রাখা হয়েছে, যেন তারা তাদের শিকড়ের কথা মনে করে। উপরে একটি সবুজ টেরাস রয়েছে, যেখানে প্রকৃতিকে আরও কাছ থেকে অনুভব করা যায়। বাতাস, আকাশ আর গাছপালার ছোঁয়ায় বাড়িটির ভেতরে একটি আরামদায়ক পরিবেশ বিরাজ করে। সেখানে সকাল শুরু হয় শান্তভাবে, আর সন্ধ্যা ধীরে ধীরে সবুজের মধ্যে মিলিয়ে যায়। |
|
|
|
ভবনটি রিইনফোর্সড কংক্রিট কাঠামোর ওপর নির্মিত এবং এর দেয়ালে উন্মুক্ত ইট ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ভবনটি মজবুত হয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনও কম পড়ে। একই সঙ্গে ইটের ব্যবহার ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা আরামদায়ক রাখতে সাহায্য করে এবং ভবনকে একটি প্রাকৃতিক ও সুন্দর স্থাপত্যিক রূপ দেয়।
ছাদ ও টেরাসে উন্নত মানের জলনিরোধক উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে, যা ভবনকে আর্দ্রতা ও পানির ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দেয়। এছাড়া ছাদের বাগান ও সবুজ টেরাস যুক্ত করা হয়েছে, যা ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, তাপ শোষণ কমায় এবং পরিবেশবান্ধব একটি আবাসিক পরিবেশ গড়ে তোলে।
জানালাগুলোতে EDF ফ্রেমের ডাবল লেয়ারের গ্লাস ব্যবহার করা হয়েছে, যা বাইরের তাপ ঘরের ভেতরে প্রবেশ কমায় এবং ভেতরের পরিবেশকে আরও আরামদায়ক রাখতে সাহায্য করে। সব দরজা কাঠের তৈরি, যা টেকসই হওয়ার পাশাপাশি ঘরে একটি উষ্ণ ও প্রাকৃতিক আবহ এনে দেয়। প্রকল্পের বিভিন্ন অংশে HPL প্যানেল, PVC মেমব্রেন ও অ্যাক্রিলিক বোর্ড ব্যবহার করা হয়েছে। এসব উপকরণ ভবনের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি, পানি থেকে সুরক্ষা এবং বিভিন্ন নকশাগত ও ব্যবহারিক প্রয়োজন পূরণে সহায়তা করে। |
|
ঘরের ভেতরের মেঝেতে মূলত পালিশ করা মার্বেল ব্যবহার করা হয়েছে, যা শীতল অনুভূতি দেয় এবং স্থানীয় আবহাওয়ার জন্য উপযোগী। উঠানের মেঝেতে টেকসই ও পিচ্ছিলতাবিরোধী ফ্লেম-ফিনিশড গ্রানাইট পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। এর সঙ্গে কাঠের ডেকিং যুক্ত করা হয়েছে, যা বাইরের এই স্থানটিকে আরও উষ্ণ ও আরামদায়ক করে তোলে।পরিবারের বসার জায়গায় কাঠের মেঝে ব্যবহার করা হয়েছে, যা স্থানটিকে আরও আরামদায়ক ও উষ্ণ করে তোলে। ভেতরের কিছু পার্টিশনে কাচের দুই স্তরের মাঝে বোনা কাপড় ব্যবহার করা হয়েছে। |
|
|
দেয়ালে টেরাকোটা ফিনিশ ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও যোগ করে। এতে প্রাকৃতিক আলো ভেতরে পৌঁছাতে পারে, আবার প্রয়োজনীয় গোপনীয়তাও বজায় থাকে। সব ক্যাবিনেট ও ফলস সিলিংয়ে ইকো-উড ব্যবহার করা হয়েছে, যা দীর্ঘস্থায়ী এবং আর্দ্রতার প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেয়। দেয়াল ও সিলিংয়ে টেক্সচারযুক্ত ফিনিশ তৈরি করতে বার্জার স্কিমার ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি বার্জার লাক্সারি সিল্ক রং অভ্যন্তরকে দিয়েছে মসৃণ ও পরিশীলিত একটি রূপ। |
|
সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, সুন্দর বিন্যাস এবং উঠানকে কেন্দ্র করে ‘পিছু ডাক’ প্রকল্পটি গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বাড়ির ভাবনাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে। এটি এমন একটি আধুনিক পারিবারিক বাসস্থান, যেখানে বিভিন্ন প্রজন্ম একসঙ্গে থাকতে পারে, সহজে মেলামেশা করতে পারে এবং চারপাশের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। |
| প্রতিবেদকঃ স্থপতি মুনিয়া আহমেদ মিম। |