-
|
বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও স্থপতি অধ্যাপক শামসুল ওয়ারেসের জীবন, স্থাপত্যদর্শন ও কর্মের ওপর ভিত্তি করে রচিত প্রামাণ্য গ্রন্থ “শামসুল ওয়ারেসঃ অ্যান আর্কিটেকচার অফ এলিমেন্টাল মর্ডানিজম”–এর মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান ৪ জুলাই সন্ধ্যায় ঢাকার আগারগাঁওস্থ বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (বাস্থই) কেন্দ্রের মাল্টিপারপাস হলে অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের স্থাপত্য শিক্ষা ও চর্চার বিকাশে অসামান্য অবদান রাখা এই স্থপতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে অনুষ্ঠানটিতে দেশের শীর্ষস্থানীয় স্থপতি ও শিল্পবোদ্ধারা উপস্থিত ছিলেন। |
|
স্থপতি শামসুল ওয়ারেস (ছবিসত্বঃ আসিফ সালমান) |
স্থপতি অধ্যাপক শামসুল ওয়ারেস বাংলাদেশের সমসাময়িক স্থাপত্যকলা চর্চা ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব। ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্থাপত্যে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃত মাজহারুল ইসলামের সহযোগী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের ঢাকা অফিসেও কাজ করার অভিজ্ঞতা লাভ করেন। শিক্ষকতাকে তিনি কেবল পেশা হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক জীবনদর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ তিন দশক তিনি বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে শিক্ষকতা করেন এবং বহু প্রজন্মের স্থপতি তৈরি করেন। বুয়েট থেকে অবসরের পর ২০০৩ সালের মার্চ থেকে ২০১৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক-এর স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবেশ বিজ্ঞান ও ডিজাইন অনুষদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর স্থাপত্য বিভাগের উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের সাথে যুক্ত রয়েছেন। |
|
একজন সক্রিয় স্থপতি হিসেবে শামসুল ওয়ারেস তাঁর নিজস্ব ফার্ম ‘সিসৃক্ষু স্থপতি’-এর মাধ্যমে অসংখ্য আবাসিক ভবন, শিল্পকারখানা, সিনেমা হল, শপিং কমপ্লেক্স এবং নগর উদ্যানের নকশা করেছেন। তাঁর নকশাকৃত অন্যতম একটি উল্লেখযোগ্য কাজ হলো গাজীপুরের ভুরুলিয়ায় অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন 'ভ্যাকেশন হাউস'। তাঁর স্থাপত্যশৈলীর মূল বৈশিষ্ট্য হলো জ্যামিতির পরিমিত ব্যবহার, উন্মুক্ত দৃশ্যপট এবং আলো ও বাতাসের অবাধ চলাচল, যা আধুনিকতাবাদের সাথে স্থানীয় আবহাওয়ার এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটায়। স্থাপত্য শিক্ষায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ সালে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট (বাস্থই) তাঁকে ‘আজীবন সম্মাননা’ প্রদান করে এবং ২০১৭ সালে তিনি সম্মানজনক ‘আইএবি গোল্ড মেডেল’ লাভ করেন। স্থপতি ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আদনান জিল্লুর মোর্শেদের সম্পাদনায় এই মূল্যবান গ্রন্থটি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা 'ওরো এডিশন্স' থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটিতে অধ্যাপক শামসুল ওয়ারেসের বহুমাত্রিক স্থাপত্যকর্মের একটি সমৃদ্ধ সংকলন তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আবাসিক ভবন, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক কার্যালয়, সিনেমা হল থেকে শুরু করে নগর উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন প্রকল্পের মূল নকশা ও ড্রয়িং। দীর্ঘ শিক্ষকতাকালীন জীবনে কীভাবে তিনি বহু প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মাঝে স্থাপত্যকে কেবল একটি পেশা হিসেবে নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতাসম্পন্ন এক জীবনদর্শন হিসেবে ছড়িয়ে দিয়েছেন—সেই অবদানগুলো এই গ্রন্থে বিশেষভাবে উঠে এসেছে। |
প্রামাণ্য গ্রন্থ “শামসুল ওয়ারেসঃ অ্যান আর্কিটেকচার অফ এলিমেন্টাল মর্ডানিজম” (ছবিসত্বঃ আসিফ সালমান) |
|
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সভাপতি স্থপতি অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ। এরপর 'কেন এই বই' শীর্ষক সূচনা বক্তব্যে বইটির সম্পাদনা ও গুরুত্বের নানা দিক তুলে ধরেন ড. আদনান জিল্লুর মোর্শেদ। সন্ধ্যার অধিবেশনে "শামসুল ওয়ারেস ও বাংলাদেশের স্থাপত্যচিন্তার বিবর্তন" শিরোনামে একটি বিশেষ প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনায় অংশ নেন দেশের খ্যাতনামা স্থপতিবৃন্দ, জালাল আহমেদ, মাহবুবা হক, মুস্তফা খালিদ পলাশ, ইকবাল হাবিব, মো. ফয়সল কবীর হিমুন এবং রেহনুমা তাসনিম শিফা। |
|
গ্রন্থটির সম্পাদক স্থপতি ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আদনান জিল্লুর মোর্শেদে (ছবিসত্বঃ সোশ্যাল মিডিয়া) |
"শামসুল ওয়ারেস ও বাংলাদেশের স্থাপত্যচিন্তার বিবর্তন" শীর্ষক প্যানেল আলোচনা (ছবিসত্বঃ সোশ্যাল মিডিয়া) |
|
শিল্পী মনিরুল ইসলাম এবং স্থপতি শামসুল ওয়ারেস যৌথভাবে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন (ছবিসত্বঃ সোশ্যাল মিডিয়া) |
|
আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী মনিরুল ইসলাম এবং স্বয়ং স্থপতি শামসুল ওয়ারেস যৌথভাবে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন। মোড়ক উন্মোচন শেষে অধ্যাপক শামসুল ওয়ারেস উপস্থিত সবার সামনে তাঁর অনুভূতি ও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। অনুষ্ঠানটির সমাপনী ঘটে একটি প্রাণবন্ত ফটো সেশন এবং লেখকের অটোগ্রাফসহ বই বিক্রির মধ্য দিয়ে। |
| প্রতিবেদকঃ স্থপতি মুনিয়া আহমেদ মিম। |