স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ হারুন উর রশীদ

স্থাপত্য ও নির্মাণ
সংলাপ
২১ জানুয়ারী, ২০২৬
১১
স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ হারুন উর রশীদ

স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ হারুন উর রশীদ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যলয়ের স্থাপত্য বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক। ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াই, হনুলুলু থেকে ১৯৮১ সালে আরবান ডিজাইন ও নগর পরিকল্পনার উপর মাস্টার্স করে দেশে ফেরত আসেন। স্থপতি হিসাবে মতিঝিলের সেনাকল্যাণ সংস্থার বিল্ডিংটির ডিজাইনে এর সহযোগী স্থপতি হিসাবে জড়িত ছিলেন। শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে UNDP এবং বিশ্ব ব্যাংকের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। জনাব হারুন দেশের অনেক বড় বড় উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে জড়িত থেকেছেন, তার এই বিশাল অভিজ্ঞতা স্থাপত্য ও নির্মাণ’-এর পাঠকদের কাছে তুলে ধরার জন্য শহরের গরীব মানুষদের জন্য বসবাসের বিষয়টি নিয়ে সংলাপ আয়োজন করা হলো। দেশের তরুণ স্থপতিদের কাছে এই শ্রদ্ধার্হ্য ব্যক্তির চিন্তাধারা পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি আমাদের লক্ষ্য রইল ভবিষ্যতে এই বিষয়ে আরও সংলাপ আয়োজনের।

স্থাপত্য ও নির্মাণ’-এর পক্ষ থেকে সংলাপে অংশগ্রহন করেছেন স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ কে. জেড. হোসেন তৌফিক যিনি স্থাপত্য ও নির্মাণের পাঠকদের কাছে উৎপল তৌফিক হিসাবে বেশী পরিচিত। উৎপল তৌফিক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে স্নাতক হবার পর ব্যাংকক এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজী থেকে নগর পরিকল্পনা এবং জার্মানীর স্টুটগার্ট ইউনিভার্সিটি (Stuttgart University) থেকে অবকাঠামোগত পরিকল্পনা (Infrastructure Planning) এর উপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রী গ্রহন করেছেন। বর্তমানে জার্মানীর বাহাউস (Bauhaus University) বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পি. এইচ. ডি প্রোগ্রামে মেগাসিটি ঢাকা শহরের উপর গবেষণা করছেন। তিনি ১৯৯৩ সালে প্রণীত ঢাকা মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় (DMDP) অংশগ্রহন করেছেন এবং রাজউক প্রণীত 'পূর্বাচল' এর ডিটেইল এরিয়া প্লানের মূল পরিকল্পক। বর্তমানে আরবান ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টরেটের পক্ষ থেকে রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পে প্রকল্প স্থপতি হিসাবে কর্মরত

Ar. Harun Ur Rashidস্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ হারুন উর রশীদ

বাংলাদেশের শহরগুলোতে জনসংখ্যা সমস্যা খুব দ্রুত গতিতে বাড়ছে, কিন্তু সেই সাথে শহরের অবকাঠামোর উন্নতি হচ্ছেনা। ক্রমবর্ধমান এই জনসংখ্যার চাপে শহরে বসবাস অসহ্য হয়ে পড়ছে। ঢাকা মহানগরী এই সমস্যার শীর্ষে অবস্থান করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৪ কোটি বা ১৪০ মিলিয়ন যার ২৪% লোক শহরে থাকেন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা মহানগরীতেই প্রায় ১৪ মিলিয়ন বা ১ কোটি ৪০ লক্ষ লোক। জনঘনত্বের দিক থেকে বাংলাদেশ পৃথিবীর শীর্ষ স্থান বজায় রেখেছে অনেকদিন ধরেই। ঢাকা ২০০০ সালে ছিল এশিয়ার ৫ম বৃহত্তম জনসংখ্যার নগর। এই মহানগরে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বসবাস ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল। শিক্ষিত ও স্বচ্ছল নগরবাসীর কাছে এসব মানুষের বসবাসের বস্তিগুলি ঘৃণার উদ্রেক করে কিন্তু তারা না থাকলে ঢাকার জীবন যাত্রার ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে সে বিষয়টা উপলব্ধি করে কেউ বেশী উচ্চবাচ্য করেন না। সভা সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, সমাধানের জন্য সরকারকে তাগীদ দেন, কিন্তু ফলপ্রসু কোন উদ্যোগ চোখে পড়েনা। স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য স্বল্প ব্যয়ের ঘর-বাড়ী তৈরী করতে হবে, এমন একটা কথা নগরবাসীর মুখে মুখে ঘোরে, কিন্তু স্বল্প ব্যয়ের ঘর-বাড়ীর বাস্তব রূপ রেখা কারও স্পষ্ট জানা নেই।

বর্তমানে দেশের প্রধান শহরগুলোতে নির্মাণের একটা জোয়ার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বেশীরভাগই ব্যক্তি মালিকানাধীন। সরকারী খাতে ইমারত নির্মাণ ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর ধারায় এগুচ্ছে। বিভিন্ন মহল থেকে বেসরকারী উদ্যোক্তাদের প্রতি স্বল্প ব্যয়ের মানুষের জন্য বাড়ী- ঘর বানানোর তাগীদ দেয়া হচ্ছে। পরিকল্পনাহীন কিছু উদ্যোগও নেয়া হয়েছে কোন কোন সময়ে যেগুলি শেষ পর্যন্ত অসফল হিসাবে অথবা অপর্যাপ্ত হিসাবে পরিগণিত হয়েছে। নগরীতে বসবাস সংক্রান্ত একটি সমাধান সূত্র বের করার তাগীদে স্থাপত্য ও নির্মাণ অনেকদিন থেকেই কাজ করে আসছে। এ পর্যায়ে আমরা দেশের প্রখ্যাত স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ হারুন উর রশীদের সাথে এক সংলাপে মিলিত হই । স্থাপত্য ও নির্মাণের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রশ্ন রাখেন স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ উৎপল তৌফিক।

Dia 1আলাপরত হারুন উর রশীদ এবং উৎপল তৌফিক

 

উৎপল তৌফিক: বাংলাদেশের শহরগুলিতে বিশেষ করে ঢাকা নগরে অতিদ্রুত জনসংখ্যা বাড়ছে, সে তুলনায় বসবাসের ব্যবস্থা নেই। স্বল্প আয়ের মানুষেরা মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। এ সমস্যা সম্মন্ধে আপনার মতামত কি?

হারুন উর রশীদ: স্বল্প আয়ের মানুষের বসবাস প্রসঙ্গ এলেই দুটো term বেশী বেশী উচ্চারিত হয় Low cost housing এবং Housing for low income group, দুটোই প্রায় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়, আসলে এ দুয়ের মধ্যে বিস্তর ফারাক। Low cost housing বা স্বল্প ব্যয়ের বাড়ী-ঘর হলো বসবাসের আয়োজনটাকে কেটে ছেঁটে সংক্ষিপ্ত আকারে কম খরচের বাড়ীতে পরিণত করা, যেমন শোবার ঘর বা বাথরুমের সংখ্যা কমিয়ে দিলে বাড়ীর আয়তন কমে যায় এবং দামও কমে যায়, আবার নির্মাণ পদ্ধতি বা নির্মাণ উপকরণে যদি সবচেয়ে ভালটা না ব্যবহার করা হয় তাহলেও দাম কমে, যেমন মেঝেতে টাইলস্ না লাগিয়ে যদি পেটেন্ট স্টোন ফিনিসিং করা হয় তাহলেও কাজ চলে কিন্তু খরচ কমে আসে, কিংবা ধর বহুতলা দালান না বানিয়ে যদি মাটির বা টিনের ছাউনি দিয়ে বাড়ী বানানো হয় তাহলেও খরচ কমে । এগুলো হলো স্বল্প ব্যয়ের বাড়ী, উন্নত মান বজায় রেখে আয়তন কমিয়েও হতে পারে আবার আয়তন ঠিক রেখে নির্মাণ উপকরণ সস্তা করলেও হয়। এমনকি দুটোই একসাথে করা যায়। সেটাই ঘটে আমাদের শহরের বস্তিতে।

স্বল্প আয়ের মানুষের হাউজিং-এর দৃষ্টিভঙ্গিটা তৈরী হয়েছে একটা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে, অনেক বড় পটভূমি থেকে সেটা আসে। সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, পরিবেশ ও জলবায়ু, জনসংখ্যা সবই এই দৃষ্টিভঙ্গিটাকে গড়ে তোলে। মানুষের আবাসন এবং তারপরে স্বল্প আয়ের মানুষের আবাসন, এই আলোচনা অনেক সময় সাপেক্ষ। আমার মনে হয় না সেটা এখানে সম্ভব।

উৎপল তৌফিক: আমাদের শহরগুলিতে স্বল্প আয়ের মানুষের আবাসন সমস্যাকেই না হয় আলোচনার কেন্দ্রে রাখুন।

হারুন উর রশীদ: কোন সমাধানের কথা চিন্তা করার আগে সমস্যাটা ভাল করে বুঝতে হবে। আমাদের এই সমস্যার কতগুলো দিক আছে । যেমন শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ঢাকা নগরীতে প্রতি বছরে শতকরা ৫ থেকে ৭ ভাগ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের একটা হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সাল নাগাদ ঢাকার জনসংখ্যা হবে ২ কোটির (২০ মিলিয়ন) কাছাকাছি। সে হিসেবে ঢাকা একটা মেগাসিটি। এখন প্রশ্ন হলো ঢাকার উপর এই চাপটা কেন? দেশেতো অনেক শহর আছে, ছোট বড় প্রায় ৫০০ এর উপর, তবু ঢাকায় এই অত্যাধীক চাপটা কেন? USA এর কোন শহরে যদি এরকম গ্রোথ হয়, ওরাও সামাল দিতে পারবে না। এই গ্রোথের হারটা কমাতে হবে, কমানোর উপায় কি?

Cam Scanner 01 21 2026 14.11.jpgতৌফিক উপগ্রহ থেকে তোলা ছবিতে দেখা যাচ্ছে তেজগাঁও বাণিজ্যিক এলাকার পেছনে গড়ে উঠেছে ঘন বসতি

 

কমানোর প্রধান উপায় বিকেন্দ্রীকরণ (decentralization), শুধু মাত্র প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ নয় বিভিন্ন প্রকার বিনিয়োগ, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবকাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। না করলে ঢাকার জনসংখ্যা বাড়তেই থাকবে কিন্তু অন্য শহরগুলো পড়ে থাকবে।রাজশাহীতে বা খুলনাতে যদি একটা দারোয়ানের ঘর বানাতে হয, তারও অনুমোদনের জন্য ঢাকায় আসতে হয়। 

সকল ক্ষমতা ঢাকায় কেন্দ্রীভূত, সার্বিক বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে, বিভিন্ন শহরে মানুষকে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমরা যদি ইউরোপের দিকে তাকাই, তাহলে দেখব ইউরোপ আরবানাইজড (urbanized) হয়েছে শিল্প বিপ্লবের যুগে এবং ঐ নগরায়ন কিন্তু সরারি ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের ফল। শহরে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, আরও বেশী উপার্জনের আশায় মানুষ শহরে এসেছে। এভাবে ওখানকার শহরে জনসংখ্যা বেড়েছে, একে বলাহয় urban pull factor. আমাদের দেশে সে পরিমান ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন হয়নি তবুও নগরায়ন হচ্ছে, আমাদের এখানে কিন্তু urban pull এর চেয়ে rural push factor কাজ করছে বেশী। অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলের অবস্থা এত খারাপ যে লোকজন কোন কাজ পাচ্ছে না, জীবিকা অর্জনের জন্য ঢাকায় আসছে। লক্ষ্য রেখ, ওরা বাড়ীর জন্য কিন্তু ঢাকায় আসছে না। বাড়ী, যেটা গ্রামে ফেলে এসেছে সেটার গুণগত মানের দিক দিয়ে হয়তো প্রশ্ন করতে পারি কিন্তু, বাড়ী একটা আছে বা ছিল, তার পরিবেশগত ও জীবন যাপনের যে মান ছিল তা শহরের বস্তির চেয়ে অনেকগুণ ভাল, তা সত্ত্বেও সেটা ছেড়ে চলে আসছে জীবিকা অর্জনের তাগিদে। এই বিষয়গুলো উপলব্ধি করে অর্থনৈতিক এবং দারিদ্র বিমোচনের পরিকল্পনার পাশাপাশি সামাজিক পরিকল্পনা ও demographic distribution পলিসি তৈরী করতে হবে। তবে নগরের জনসংখ্যা এতে করে কমবে না, বৃদ্ধির হার গ্রহনযোগ্যমাত্রায় আনা যাবে। এখন এই যে লোকজন আসছে তাদের বেশীরভাগই ত স্বল্প বিত্তের মানুষ, সরাসরি জমি কিনে বা বাড়ী কিনে নগরবাসী হতে পারবে না। কাজের খোঁজে এসেছে, উঠছে বস্তিতে, বস্তির সংখ্যা বাড়ছে। বস্তিতে নাগরিক সার্ভিস নেই, ফলে জীবন-যাপন নিম্ন মানের হবেই। সেখানেই সমস্যা, এই নবাগত মানুষেরা থাকার জন্য বেশী পয়সা খরচ করতে পারছেনা, বস্তির ভাড়া গুনতেই কষ্ট হয়, তাদের জন্য সুন্দর, রুচী সম্মত ঘর-বাড়ী কিভাবে হবে?

গরীব মানুষেরা যে বস্তিতে থাকে পরিকল্পনাবিদরা তাকে দুইটি নাম দিয়েছেন। এক হলো স্লাম (slum), যে ঘরগুলোর একজন আইনগত রেগুলার মালিক আছে, ঘরের অবস্থা খারাপ কিছু মালিক আছে এবং তাকে ভাড়া দিতে হয়। আইনত: এগুলোকে সরিয়ে দেয়া সম্ভব নয় যতক্ষণ না ঐ মালিক নিজেই এসব ঘর ভেঙে উন্নত বাড়ী বানানোর উদ্যোগ নেবেন। অন্যটি হলো স্কোয়াটার (squatter), সাধারণত: এগুলো গড়ে উঠে সরকারী/বেসরকারী অব্যবহৃত জমিতে, রেল লাইন, রাস্তা, নদী, ডোবার পাশে বেআইনী বসবাস।

 Dia 2 

বাসিন্দারা হয়তো স্থানীয় মাস্তানকে একটা ভাড়া দেয়, কিন্তু তারা সকলেই জানে তাদের যে কোন সময়ে জায়গাটা ছেড়ে দিতে হতে পারে। slum কে ভেঙে উন্নয়ন করা সহজ কিন্তু squatter সরানো মোটেই সহজ নয়, সেখানে স্থানীয় মাস্তান, রাজনৈতিক দলগুলির স্বার্থ জড়িত। এই slum বা squatter যাই হোক, এখানে যে মানুষগুলো থাকে তাদের ছাড়া কিন্তু নগর চলবে না। এখন প্রশ্ন হলো এদের জন্য কিভাবে এই নগরে বসবাসের ব্যবস্থা করা যায়, এ নিয়ে বহু মত রয়েছে তবে আমি বলতে পারি পৃথিবীতে কোথাও গরীব মানুষকে সরকারী খরচে বাড়ী করে দিয়ে বসবাসের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হয়নি। বাড়ী করে দিলেও অভাবের কারণে সে ওটা বিক্রী করে দিবে, অন্যত্র চলে যাবে আবার নতুন বস্তি করার জন্য।

উৎপল তৌফিক: বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পর ঢাকা শহর থেকে বস্তি উচ্ছেদ করে পূনর্বাসনের জন্য ভাষানটেক, দত্তপাড়া আর ডেমরায় বস্তিবাসীদের জন্য জমি ও কিছু ঘর-বাড়ী দেয়া হয়েছিল, পরবর্তী বিভিন্ন সরকার ঐ জায়গাগুলোতে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছে, কিছু নতুন এলাকাও বরাদ্দ করেছে, উদ্দেশ্য বস্তি পূনর্বাসন করা। এগুলো করে কিন্তু ঢাকার কোন উন্নতি হয়নি, বস্তিও কমেনি, যাদের শহর থেকে সরিয়ে ঐ প্রান্তিক এলাকাগুলোতে নেয়া হয়েছিল, কিছুদিনের মধ্যেই তারা ফিরেও এসেছে, আপনি একটু আগেই বললেন, ওদেরকে শহরে দরকার আছে। যদি এই প্রয়োজনটা আমরা মানি তাহলে তাদের মানবেতর জীবন যাপনটা কিভাবে গ্রহনযোগ্য হয়? ঢাকা নগরীতে জমির যা দাম তাতে এখানে ওদের জন্য জমি বরাদ্দ করা কঠিন, কিন্তু যদি কিছু লোককে কুমিল্লা বা ময়মনসিংহে রাখি এবং ঢাকায় তাদের প্রতিদিন যাওয়া আসার সুব্যবস্থা করা যায় তাহলে কি সমাধান হবে? সকলেই তাদের কর্মক্ষেত্রের কাছাকাছি থাকতে চায়, কিন্তু ভাল ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম থাকলে দূরে হলেও একটু ভালভাবে থাকতে পারত, আপনার কি মত?

হারুন উর রশীদ: তুমি ঢাকা থেকে সেই লোক নিয়ে যাওয়ার কথাই বলছ, তারমানে জ্বর আসলে আমরা বড়ি খাই, জ্বরতো কোন অসুখ না Symptom মাত্র, কোন একটা ইনফেকশনের কারণে জ্বরটা এসেছে, একটা বড়ি খেয়ে তাকে ধামাচাপা দিতে পারি কিন্তু মূল অসুখটা না সারলে জ্বরতো আবার আসবে। প্রথমে এটা করতে হবে তারপর ওটা করতে হবে এরকম একটা বাধ্যবাধকতার কথা আমি বলছি না। মূল সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ না নিলে সমস্যা থেকেই যাবে, সেই সমস্যাগুলো হল কর্মসংস্থান, দারিদ্র বিমোচন এবং distribution of population.

Dia 3

Dia 5

হারুন উর রশীদের বসবার ঘরে আলাপ চলছে

উৎপল তৌফিক: বস্তি পুনর্বাসন প্রচেষ্টাগুলো কেন ব্যর্থ হলো সেটা না বুঝলে সমস্যাটা পুরোপুরি বুঝতে অসুবিধা হবে, ব্যর্থতার কারণগুলো কি?

হারুন উর রশীদ: সে কথায়ই আসছি, প্রথমত: দরিদ্র জনগোষ্ঠির আয়ের বৃহ অংশ যায় খাবার যোগাতে, রোজগার করার স্থান থেকে দূরে থাকা একটি বাড়তি খরচ, রোজগার করার স্থান থেকে দূরে কেউ থাকতে চায়না, থাকাই'ত তাদের জন্য প্রধান সমস্যা নয়, তাহলে'ত গ্রামেই ভাল ছিল, তাদের কাজ দরকার, কাজের সন্ধানে শহরে এসেছে, কাজ থেকে দূরে থাকলে কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাই সরকারী জায়গা ফেলে আবার শহরে ফিরে আসছে।রিক্সাওয়ালার কথাই ধর, তার স্ত্রী হয়ত বাসা-বাড়ীতে কাজ করে, গাজীপুরে পাঠিয়ে দিলে দুজনেই বেকার। 

 

Dia 4

urban development শুধুমাত্র রাস্তা-ঘাট আর দালান কোঠা নয়, নগর একটা অর্থনৈতিক সামাজিক একক। পলিটিশিয়ানরা স্লোগান দেয় 'গ্রাম বাঁচলে দেশ বাঁচবে', অষ্ট্ৰেলিয়াতে নাকি মানুষের চেয়ে ভেড়ার সংখ্যা বেশী, কিন্তু জি.ডি.পি দেখলে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে পশুপালনের এবং কৃষির অবদান অন্যান্য সেক্টরের চেয়ে অনেক নীচে। শহর অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের একটা জমাট আসর। গ্রাম থেকে মানুষ তাই শহরে যায়, ছোট শহর থেকে বড় শহরে, সেখান থেকে বড় নগরে-মহানগরে, এর উল্টোটা হতে দেখিনি। ঢাকা বড় হচ্ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে অন্যান্য ছোট শহর। আমি চট্টগ্রামের ছেলে। চট্টগ্রামে যারা ভাল ব্যবসা করত, ট্রাডিশনাল ব্যবসায়ী যত জনকে আমি চিনতাম, প্রায় সবাই ঢাকায় চলে এসেছে, সেন্ট্রালাইজেশনের কারণে। প্রায় বছর দুই আগে আমার ছোট ভাইয়ের বন্ধু, তাদের বাড়ীতে ডাকাত পড়েছে। সে এক ডাকাতকে ধরে ফেলেছে। আরেক ডাকাত তাকে গুলি করেছে। গুলি হার্ট ছুঁয়ে চলে গেছে। চট্টগ্রামে হাসপাতালে ২৪ ঘন্টা তাকে রাখা হয়েছিল, ওখানে তাকে অপারেট করার মত একজন হার্ট সার্জেন পাওয়া যায় নাই, অথচ বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর! কাউকে ত বাধ্য করা যায় না যে, তুমি এখানে থাকবে। সব ব্যবসার, সব ক্ষমতার, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের, সব সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু যদি হয় ঢাকা তাহলে যে সব লোকেরা ঐসবের সাথে জড়িত তাদের ঢাকাতে চলে আসতে হবে। অন্যদিকে যে নিজের জমি চাষ করে তার প্রয়োজন না পড়লেও, যে লোকটা ক্ষেতমজুর, নিজের জমি নেই, সে বেশী উপার্জনের আশায় শহরে আসবে। আমাদের সমস্যা হলো সকলেই ঢাকায় আসতে চাচ্ছে, অন্য শহরে অতটা ভীড় জমছে না। ঢাকায় যে পরিমান বস্তি আছে অন্য শহরে তা নেই । তাই ঢাকায় অত্যধিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

বস্তি পূনর্বাসন প্রক্রিয়াটিকে অনেকগুলো বিষয়ের সাথে সমন্বিত করে ভাবতে হবে। মূল বিষয়গুলো সমাধান হলে বস্তি সমস্যা থাকবে না। মানুষের শহরমুখীনতা বন্ধ করার কোন উপায় নেই, urbanization বাড়তেই থাকবে, কিন্তু অন্য শহরগুলোতে যদি কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক অবকাঠামো, ভাল হাসপাতাল, দোকান-পাট, শিল্প-কারখানা ইত্যাদি গড়ে উঠে এবং সেই সাথে যদি রাজনৈতিক ক্ষমতারও বিকেন্দ্রীকরণ হয়, তাহলে মানুষ সেখানেও যাবে। ওসব জায়গায় জমির দাম কম, মানুষ যদি একটা স্বাচ্ছন্দ জীবনের নিশ্চয়তা পায় তাহলে ওখানেই ঘর-বাড়ী করবে। মানবেতর জীবন-যাপন করতে কে চায়? অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন হলে মানুষ নিজের বাড়ী-ঘরের জন্য টাকা খরচ করতে পিছপা হয় না। প্রায় ১৫ বৎসর আগে একটা সেমিনারে অংশগ্রহন করেছিলাম, গরীব মানুষের জন্য হাউজিং নিয়ে কথা হচ্ছিল, ঐখানে প্যানেলিস্টের মধ্যে প্রফেসর ইউনুসও ছিলেন, গণস্বাস্থ্যের ডাঃ জাফরুল্লাহ সাহেবও ছিলেন । জাফরুল্লাহ সাহেব বললেন, এ দেশের মানুষ এত গরীব এরা বাড়ী কিনতে পারবে না, এদের বাড়ী সরকারকেই করে দিতে হবে । প্রফেসর ইউনুস বললেন, আপনি যা বললেন তাতে আপনার মহত্ত্বের পরিচয় বহন করে, কিন্তু এতে সমস্যার সমাধান হবে না । আপনি যদি মাত্র দশ টাকা করেও দেন তবুও দিয়ে কুলাতে পারবেন না, কারণ দেশের অত পয়সা নেই। বস্তিতে যারা থাকছে তারা'ত বিনা পয়সায় থাকতে পারছে না । তাদের জন্য গ্রহনযোগ্য প্রোগ্রাম থাকলে তারাও টাকা খরচ করতে পারে। একেবারে দালান কোঠা না হলেও স্বাস্থ্য সম্মত বসবাস তাদের পক্ষে সম্ভব ।

উৎপল তৌফিক: তাহলে আপনি বলছেন, একটা দুটো বস্তি সরিয়ে সমস্যা সমাধান হবে না। population distribution এর নীতিমালা করতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এবং তা করতে হবে সামগ্রিক decentralization এর মাধ্যমে। দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ঘাটতির দিকেই আমরা এগুচ্ছি মনে হয়। আমরা যেহেতু physical development বা কাঠামোগত উন্নতির সাথে জড়িত, সেজন্য এ প্রসঙ্গে জানতে চাই, আপনি কি দেশের একটা সামগ্রিক কাঠামোগত পরিকল্পনার পক্ষে, যেখানে road network থেকে শুরু করে সকল landuse plan নির্দেশ করা থাকবে?

হারুন উর রশীদ: আমি ঠিক কঠোর একটা নির্দিষ্ট প্লানের পক্ষে না বরং পলিসির পক্ষে। আমি ঢাকায় বসে রাজশাহীর জন্য প্লান করতে চাই না এবং তা রাজশাহীবাসীর কাছে গ্রহনযোগ্যও হবে না ।

উৎপল তৌফিক: সারা দেশের transport planning করতে গেলে' আপনাকে একটা নির্দিষ্ট প্লানই করতে হবে, স্থানীয় পর্যায়ে আর কতটুকু input পাওয়া যাবে?

 

Dia 6

কমলাপুর এলাকা

 

 হারুন উর রশীদ: মানুষের চিন্তার সীমাবদ্ধতা আছে। সময়ের সাথে সাথে সব কিছুরই পরিবর্তন হয়, চিন্তা ধারাও বদলায়। প্লানিং করার সময় অনেকগুলো assumption কে ভিত্তি করে এগুতে হয়। এটা এমন একটা পদ্ধতি যেখানে যতবেশী assumption, তত বেশী কাজটা সহজ হবে। মনে কর, একটা শহরের জন্য পরিকল্পনা হবে, আগামী ২০ বছরের বা ৩০ বছরের একটা সময় ধরে নিতে হবে। ঐ সময়ে শহরের জনসংখ্যারও একটা ধারণা থাকতে হবে। এসব ধারণাগুলো আরও ডিটেইলে নিয়ে গেলে assumption এর সংখ্যা আরও বাড়বে, যেমন প্রতি পাঁচ বছর পর পর জনসংখ্যা কত বাড়বে। এসব assumption এর অবশ্যই বাস্তব ভিত্তি আছে কিন্তু এগুলো শেষ পর্যন্ত একটা assumption ই বটে। ঢাকার জনসংখ্যার কথাই ধর, ১৯৫৯ সালে যখন প্রথম master plan করা হয় তখন জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখ ২৫ হাজার । ধরা হয়েছিল ১৯৮০ সালে গিয়ে দাঁড়াবে ১৪ লাখ ৪০ হাজার কিন্তু বাস্তবে তা হয়েছিল ৩৩ লাখ ৭৫ হাজার এবং ২০০০ সালে ছিল ৯০ লাখ ৪০ হাজার। সেজন্য নির্দিষ্ট প্লান করা বিশেষ করে একটা শহর, অঞ্চল বা দেশের জন্য সম্ভব হয় না। তুমি ট্রান্সপোর্টের কথাটা তুলেছ, যে কোন দেশের উন্নতিতে ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে তুমি যদি পাকিস্তান আমলের রোড নেটওয়ার্ক দেখ, তাহলে দেখবে কিছু node (সংযোগ কেন্দ্র) থেকে ছড়িয়ে গেছে। এই diverging transportation বৃটিশ রাজত্বের সময়ও ছিল। দেখা যায় সেই পয়েন্টটাতে সকল এলাকার রাস্তাগুলো মিলিত হচ্ছে। ঐখান থেকেই কিন্তু শুষে নিচ্ছে। আজকে তুমি রংপুর পর্যন্ত ভাল রাস্তা করলে, আগে হয়তো মানিকগঞ্জ থেকে সবজি আসত, খন রংপুর থেকে চলে আসে, রংপুরের মানুষ সবজি পায়না। Decentralize না করে transportation করলে প্রান্তিক এলাকার মানুষের ক্ষতি হয়, লাভ হয় না । সবজির চাষীরা এর জন্য খুব ভাল দাম পায় না, কিছু middleman রা পেয়ে যায়। দেশের ৭৫% জমির মালিক ২৫% লোক, লাভ তাদেরই হবে বেশী। ঐ যে লোকটা সারাদিন জমিতে খাটছে ওরতো কোন উন্নতি হয় না। শেসাহেবের আমলে একবার মানিকছড়ি গেলাম, তখন চালের দাম ঢাকায় ৪ টাকা বা ৫ টাকা। মানিকছড়ি প্রত্যন্ত এলাকা, সেখানে চালের দাম পাঁচ সিকা সের, কিভাবে এই খবর ফড়িয়াদের কাছে পৌঁছে গেল, গরুর গাড়ী করে এসে চালের বাজার সাফ করে নিয়ে গেল। এলাকার লোকজন কিনতে পারে না। উন্নত অর্থনীতির দেশে রাস্তার নেটওয়ার্ক জালের মত হয়। এতে অনেক intersection গড়ে উঠে, বহু পাশাপাশি growth point এর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ তৈরী হয়। এই পাশাপাশি যোগাযোগ না তৈরী করে শুধু কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ তৈরী হলে শোষণই বাড়ে।

উৎপল তৌফিক: কিন্তু কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ থাকলে technology transfer দ্রুত হয়। গ্রামের সাথে রাস্তা হলে, গ্রামের শাক-সবজি শহরে চলে আসে, গ্রামের মানুষ কিনতে পারে না, আবার মাছের বাড়তি চাহিদা মেটানোর জন্য শহর থেকে আধুনিক চাষ পদ্ধতি, উচ্চ ফলনশীল বীজ এগুলো গ্রামে চলে যাবে এবং গ্রামের উৎপাদনশীলতা বাড়বে। গ্রাম থেকে যে সবজি ঢাকায় আসত তা এখন বিদেশে চলে যাচ্ছে, গ্রামে বেশী উৎপাদনের চাপ বাড়ছে। তবে আপনি যে শোষণ প্রসঙ্গে বলছেন সেটা মনে হয় শুধুমাত্র technology transfer দিয়ে বদলে দেয়া যায় না। অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অনেক বিষয় এর সাথে জড়িত। বিমান থেকে দেখলে দেখা যায় অনেক বড় বড় শহরের রাস্তা ঘাট গ্রীড আয়রন (grid iron) পদ্ধতিতে সাজানো, ব্যাংকক নগরীর বাইরেও অনেক বিশাল এলাকার কৃষি জমি এই একই পদ্ধতিতে ভাগ করা হয়েছে। লক্ষ্য করা যায় জালের মত রাস্তার পাশাপাশি কতগুলি প্রধান রাস্তা এবং সেচের খাল সোজা চলে গেছে। আপনার কথা অনুযায়ী মনে হয় দুটো ধারণাকে এখানে সমন্বিত করা হয়েছে। আমরাও যদি এই গ্রীড আয়রন বা জালের মত রাস্তাগুলোকে ছাড়িয়ে দেই, তাহলে প্রতিটা ক্রস সেকশন বা মোড়েই কমপক্ষে কয়েকটা দোকান-পাট গড়ে উঠবে।

Dia 7'স্থাপত্য ও নির্মাণ'-এর সম্পাদকের সাথে হারুন উর রশীদ

ঐ মহল্লার দোকানগুলোতে মুড়ি আর রুটি কিনতে হয়ত লোকে যাবে কিন্তু কাপড়-চোপড় বা ইলেক্ট্রনিক্স এর জিনিস কিনতে বড় রাস্তা ধরে শহরের কেন্দ্রে বড় বড় শপিং সেন্টারে চলে আসবে। মোড়ের ছোট দোকানের catchment area খুবই কম, ঢাকার ইসলামপুর বা নিউমার্কেটের catchment area সারা বাংলাদেশ। ছোট ছোট গ্রোথ পয়েন্টগুলোকে যদি সাপোর্ট দেয়া যায় বা তারা যদি পরস্পরকে সহযোগীতা করে তাহলে স্থানীয়ভাবে কিছুটা লাভবান হতে পারে হয়ত, কিন্তু সারাদেশের মধ্যে একটা সমসত্ত্বতা আনতে হলে নেশন ওয়াইড পরিকল্পনার কথাই বার বার সামনে চলে আসে।

হারুন উর রশীদ: এই সমসত্ত্বতা কিন্তু সমতা নয় । অর্থাৎ সকল শহরেই একটা করে আন্তঃজিলা ট্রাক টার্মিনাল গড়ে তুলতে হবে তা নয়। গ্রোথ সেন্টারগুলিকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের মাপকাঠিতে যথাযথ মূল্যায়ন করে সারা দেশে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাগুলোকে ছাড়িয়ে দিতে হবে। এর মধ্যে কোন কোন শহরে হয়ত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি পাবে এবং তা ঘটবে তার ভৌগলিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতেই, আবার কোন শহর হয়ত কিছুটা বঞ্চিত হবে, তার কারণ তার কাছা কাছি ঐ সুবিধাটা আরেকটি শহরে থাকছে এবং ঐ সুবিধাটি স্থাপনের জন্য ২য় শহরটির যোগ্যতা বেশী। প্রতিটি শহরে একটি করে মেডিকেল কলেজ স্থাপন করার দরকার নেই, তেমনি একটা শিল্প নগরীতে একটা ট্রাক টার্মিনাল থাকাটা বেশী দরকার। এই পরিকল্পনাটা থাকলে সমগ্র দেশের উন্নয়নের একটা সমন্বয় হয় এবং বিনিয়োগও সেই অনুযায়ী হতে থাকে। একসময় বলা হতো uniform development of the country কিন্তু uniform development for the country বলে না । সব যায়গায় সমানভাবে সব কিছু করা সম্ভব হয় না। মাখন কম থাকলে, একজায়গায় একটু বেশী করে দিলেও মাখনের টেষ্টটা অন্তত পাওয়া যায়। অল্প মাখন দিলে রুটির গন্ধটাই পাওয়া যাবে, মাখন আছে বলে মনে হবে না। যেমন ধর, ঢাকার ক্যাচমেন্ট এরিয়া সারা বাংলাদেশ, চট্টগ্রামের ক্যাচমেন্ট এরিয়া সারা বাংলাদেশ কিন্তু রাজশাহী বা রংপুরের ক্যাচমেন্ট এরিয়া তা নয়। ময়মনসিংহ ঢাকার খুব কাছে। ঢাকা থেকে নতুন প্রযুক্তি ময়মনসিংহে পৌঁছাবে খুব দ্রুত। সুনামগঞ্জ এবং নেত্রকোনা পাশাপাশি জিলা কিন্তু আগে সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকা এসে তারপর নেত্রকোনা যেতে হত। যদি সুনামগঞ্জে কোন নতুন চাষ পদ্ধতি আবিষ্কার হয় তা নেত্রকোনায় পৌছাতে অনেক সময় লেগে যাবে। সরাসরি যোগাযোগ থাকলে এই ডেভেলপমেন্ট দ্রুত হবে। বগুড়াতে যদি একটা হাইটেক ইলেকট্রনিক্স ইন্ডাস্ট্রি হয় তাহলে ঢাকা থেকে লোক নিয়ে যেতে হবে, ওখানে ঐ ধরনের কোয়ালিফায়েড লোক পাবে না। করতে হলে আয়োজনটা বড় করতে হবে, এই ইন্ডাস্ট্রির জন্য হয়তো হাউজিং লাগবে, একটা বাজারও বসবে, আরও অনেক কিছু। এতে উদ্যোক্তা পিছিয়ে যাবে, সেজন্য সামগ্রিক পরিকল্পনা করে বিভিন্ন যায়গায় বিভিন্ন ধরনের ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থা করতে হবে। তার জন্য প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেবার লোক যেমন তৈরী করতে হবে তেমনি সার্ভিসগুলোও সহজে পাবার ব্যবস্থা করতে হবে।

 Sma 2

পশ্চিমবঙ্গের এক অর্থনীতির গবেষক, সে কৃষির উন্নতির উপর একটা গবেষণা করেছে। কুষ্টিয়ার কাছে বর্ডারের এপাশে একটা থানা আর পশ্চিমবঙ্গের বর্ডারের ওপাশে একটা থানা নিয়েছে । তার প্রধান বিষয় ছিল ৬৫-৭৫ সালের দিকে যে গ্রীন রিভোল্যুশনের জোয়ার এসেছিল তার ফলটা কোথায় কেমন, গরীবের কাছে এর ফল কতটুকু পৌঁছেছে সে সম্মন্ধে একটা সিদ্ধান্তে আসা। তার গবেষণার ফল হল যে, পশ্চিম বঙ্গের ঐ থানায় কৃষকের উন্নতি হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে হয়নি, অথচ পাশাপাশি জায়গা। প্রধান কারণ, পশ্চিমবঙ্গের সরকার গ্রামকে যথেষ্ট পরিমান ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে, বাংলাদেশে যা ছিল তাই আছে। সামাজিক ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তন হয়নি।

উৎপল তৌফিক: এন.জি.ও গুলোর মাধ্যমে কিছু সাফল্য'ত এসেছে.....

হারুন উর রশীদ: না, না এনজিওর সাফল্য সাময়িক, এটা দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। আমি অনেকদিন ধরে ডোনারদের সাথে কাজ করছি, ওরা আসে, সরকারের সাথে মিটিং করে, বিভিন্ন রিসার্চ করে তারপর নিজেদের একটা এসেসমেন্ট দেয় । বলে উন্নয়নের কাজে local govt. কে সম্পৃক্ত কর । মন্ত্রীরাও বক্তৃতা দেয়, একই কথা বলে, কিন্তু কাজ এগুচ্ছে না । আমার মনে হয়, এই পথে হয়তো অনেক বাধা-বিপত্তি হবে, তখন পথের মধ্যে ছোট-খাট পরিবর্তন করে এগুতে হবে, আমার লক্ষ্য থাকবে স্থির । কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত নেবার লোকগুলো খুব চালাক, বলেনই শুধু করতে চান না । এদেশে প্রথম ৬৪ টা পৌরসভা করতে ১৫০ বছর লেগেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরানো পৌরসভা কোনটা জান? যশোর, ১৮৬২ সালে, মনেহয় ঢাকা পৌরসভার ১ বছর আগে। যশোরের কিন্তু অবিভক্ত বাংলায় খুলনার চেয়ে উচ্চতর স্ট্যাটাস ছিল। যশোর সোসাইটি লাইব্রেরী হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরানো লাইব্রেরী। সম্ভবতঃ ১৮৪৫-এ। মজার ব্যাপার হলো পৌরসভাগুলোতে কেউ ট্যাক্স আদায় করে না, কারণ ট্যাক্স চাইলে জনপ্রিয়তা কমে যাবে, ইলেকশনে হেরে যাবে, সেজন্য সার্ভিসও দেয় না। পৃথিবীব্যাপী এটা প্রমানিত যে সার্ভিস দিলে লোকে পয়সা দিতে রাজি হবে, এখন আমাদের পৌরসভাগুলোতে ওরা হা করে বসে থাকে কখন সরকার অনুদান দিবে। অনুদান দেবার সময়ে দেখা হয় পৌরসভায় নিজেদের দলের লোক আছে কি না। অনুদানের নিয়ম, অনুদান থেকে কর্মচারীদের বেতন দেয়া যাবে না, অনেক সময় দেখানো হয় রাস্তা মেরামত করা হয়েছে, কিন্তু আসলে কর্মচারীদের বেতন দেয়া হয়েছে। এইভাবেই চলে আসছে। যে পৌরসভা দেখা যায় ভাল ট্যাক্স অদায় করেছে সে অনুদান পায় ৫ লাখ টাকা আর যে কিছুই আদায় করতে পারে নাই সে পায় ১ কোটি টাকা, তো ইনসেনটিভ কোথায় ভাল করার? কিছু কিছু পৌরসভা দেখাচ্ছে ৮০% ট্যাক্স আদায় করছে, কিন্তু গত ৩০-৩৫ বৎসরে একবারও Assesment হয় নাই। সার্ভিস কি বিনা পয়সায় হয়? ডেভেলপমেন্ট কি বিনা পয়সায় হয়? এই বিনা পয়সায় সবকিছু পাবার মানসিকতার পরিবর্তন না হলে উন্নতি সম্ভব নয়। ছোট শহরগুলোর মানুষদের নিজেদের উন্নতির জন্য উদ্যোগী হতে হবে, তাহলে বিকেন্দ্রীকরণ সহজ হবে। এক সময় নোয়াখালি পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিল রবিউল হোসেন কচি, বহু আগে চট্টগ্রাম কলেজে পরিচয়। খুব মজা করে কথা বলে, 'আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পরে নোয়াখালিতে পয়ঃনিষ্কাশন অবস্থা খুবই খারাপ, ভাবলাম পৌরসভার কিছু পয়সা খরচ করে এর অবস্থার উন্নতি করি। আমার বিরোধী দলেরা প্রচার করল, 'আননেরা একজন চেয়ারম্যান বানাইছেন হেতে হাগনের উফর ট্যাক্স বহাইছে ।' আমি মাঝে মাঝে বলি, এ দেশটা সোজা হবে যদি সব ডোনাররা একসাথে উইথড্র করে চলে যায়, ১০- ২০ বছর হয়ত কষ্ট করবে তারপর ঠিক হবে । তুমি যদি জান যে, তোমার বড় ভাই আছে, সমস্যায় পড়লে তার কাছে যেতে পারবে, তবে তুমি দায়িত্বহীন হয়ে পড়বে । আর যদি জান তোমার কেউ নেই, নিজের ঘর নিজেই সামলাতে হবে, তবে দায়িত্ববান হবে ।

 Sma 

উৎপল তৌফিক: আমরা আবার শহরের গরীব মানুষের বাসস্থানের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। ছোট ছোট শহরগুলোকেও গড়ে তুলতে হবে যাতে ঢাকা বা চট্টগ্রামের উপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সেজন্য ঐ সব শহরের বাসিন্দাদের উদ্যোগ থাকতে হবে। সরকারের decentralization এবং demographic distribution নীতিমালা থাকতে হবে। এ সমাধান রাতারাতি ফল দিতে পারবেন। কিন্তু আমাদের এখন শিরে সংক্রান্তি, ঢাকার জনসংখ্যা বর্তমানেই ১ কোটি ৪০ লক্ষ এবং ১০ বছরের মধ্যে হয়ত ২ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এই বাড়তি মানুষের বেশীরভাগই দারিদ্র্য সীমার নীচে। এদের রোজগার হয় অল্প, ট্যাক্স কিছুই দেয় না। এরা কোথায় থাকবে, কিভাবে থাকবে এবং তাদের জন্য এখন আমরা কি করতে পারি?

হারুন উর রশীদ: আগেই বলেছি এদের জন্য বাড়ী-ঘর করে দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। এরা গরীব হলেও কিছু না কিছু অনেক কাজ করে। বিনা পয়সায় তারাও কিন্তু থাকতে পারছে না। ঢাকার কোন কোন বস্তিতে প্রতি বর্গফুটে ১০ টাকারও বেশী ঘর ভাড়া । squatter বা অবৈধ বস্তিগুলোতেও স্থানীয় মাস্তানরা ভাড়া তুলে। বস্তিতে গ্যাস নাই, বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ ভাড়ার বিনিময়ে পাওয়া যায়, পানি সাপ্লাই নাই, পয়সা দিয়ে কলস ভর্তি করে লাইন দিয়ে পানি কিনতে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে তাদের টাকা ঠিকই খরচ হচ্ছে, বাসস্থানের জন্য তারা খরচ করতে পারে, কিন্তু এককালীন টাকা দিতে পারবে না। এখন বাড়ী-ঘর যা বানানো হচ্ছে সেটা ওদের নাগালের বাইরে। সমাজে অনেক লোক আছে যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা এর খারাপ যে ভিক্ষুকের চেয়ে ভাল না, হয়তো বংশের সুনামের কারণে ভিক্ষাটা করতে পারছে না, কিছু না কিছু কাজ করে দিন চালাচ্ছে, তো ওদেরকি সমাজে প্রয়োজন নাই? সামাজিক ন্যায়বিচারের দিক থেকে দেখলেও সমাজের প্রতি স্তরের জন্য কিছু consideration থাকতে হবে। ধনী লোকেরা হয়তো প্লট কিনে বাড়ী বানাবে অথবা ফ্লাট কিনবে, মধ্যবিত্তরা ছোট ফ্লাট কিনবে বা ভাড়া করবে, গরীবরা কি করবে? বর্তমানে তাদের জন্য বস্তি ছাড়া কিছু নেই। বাসস্থান একটা মৌলিক চাহিদা, দেশের উন্নয়ন পলিসিতে শহরের গরীবদের জন্য একটা ব্যবস্থা রাখতে হবে। রাতারাতি এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বাসস্থানের সমাধান করা সম্ভব নয় সেটা আমরা সকলেই বুঝি কিন্তু একটা স্ট্র্যাটেজি থাকলে সে অনুযায়ী সুযোগমত এগুবার ব্যবস্থা করা যেতে পারে ।

উৎপল তৌফিক: যেসব অবৈধ বস্তি আছে, তার বেশীরভাগ অব্যবহৃত সরকারী জমির উপর। সেখানে এই মুহুর্তেই হয়ত কোন কিছু তৈরী করা হচ্ছে না বা কোন কাজে লাগানো হচ্ছে না, যদি এসব জায়গায় নির্দিষ্ট মেয়াদে তাদের থাকার অধিকার দেয়া হয়?

হারুন উর রশীদ: সেটা একটা পদ্ধতি, তবে কোন সংস্থাই এই অধিকারটা কাগজে কলমে দিতে চাইবে না। আমি বলছি পলিসির কথা, একটা জায়গা যদি এরকম ভাবে নেয়া হয়, সে তো চিরদিনের জন্য নয়, তাহলে মেয়াদ শেষ হলে কি হবে সেই নির্দেশনাটা এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাটা থাকতে হবে । অনেকেই বলেন ওরা পয়সা দিবে না, আমার মনে হয় ধারণাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। ডাঃ দিবালক সিংহকে মনে হয় চিনতে পার, এনজিও করে। এনজিওর নাম দুঃস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (DISC) আমি যখন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সাথে কাজ করি তখন এক ওয়ার্কশপে তার সঙ্গে পরিচয়, নিষ্ঠাবান লোক। সে কথায় কথায় বললো, আমরা দুইটা water point করেছি, বস্তিবাসীরা মাসিক পয়সা দিয়ে ব্যবহার করে, আমি আগ্রহ নিয়ে দেখতে গিয়েছিলাম। দুটো পানির পয়েন্ট করেছে ঢাকা শহরে। জিজ্ঞেস করলাম, যদি টাকা যোগাড় করে দেই শ'খানেক এরকম করতে পারবেন কি না? বললো, কেন পারব না? এসডিসি ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে লেখালেখি করে ৬০,০০০ ডলার জোগাড় করে দিলাম। পরে ওয়াটার এইড ও কিছু টাকা দেয়। ওরা ১৫০ টি করেছে, ছোট ভিডিও বানিয়েছে, বুকলেট তৈরী করেছে। আমরা ভাবলাম যে, মহিলারাই বেশী পানি ব্যবস্থাপনার কাজ করে, পুরো প্লানিং এবং সিদ্ধান্তের সাথে মহিলাদের সম্পৃক্ত করা হলো । ওয়াসার কাছে দরখাস্ত করে water point গুলোকে বৈধ করা হল । প্রথমতো ওয়াসা দিতে চাইল না । আমরা বললাম, আমরা গ্যারান্টি দিচ্ছি, বস্তিবাসী যদি পয়সা না দেয় আমরা দিব, ওয়াসা বলল, এদের ত জায়গা জমি নাই, কিভাবে দিব, ওয়াসার চেয়ারম্যান তখন জনাব নুরুল আলম, বললাম ' আপনি পানি দিবেন, পয়সা পেয়ে সন্তুষ্ট থাকবেন, জমি নেই তাতে আপনার মাথা ব্যাথা কিসের? এরপর ওরা মিটার বসিয়ে দিল। বস্তির লোকেরা সমিতি করে, ঘর করে, কেয়ারটেকার বসিয়ে পুরা ব্যাপারটা organise করে ফেলল। একজন কেয়ারটেকার সকাল ৮ টা থেকে ২ টা এবং আরেকজন ২ টা থেকে রাত ৮ টা পর্যন্ত থাকবে, মোট ১২ ঘন্টা খোলা রাখে। Regularly ওয়াসার বিলই দেয় না, কেয়ারটেকারের বেতন দেয়, রক্ষণাবেক্ষণ করে আবার কিছু সঞ্চয়ও হয়। এগুলো ছোট উদাহরণ, কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে ভাল সার্ভিস দিয়ে পয়সা চাইলে একদম গরীব মানুষও পয়সা দেয় তার প্রমান ওই উদ্যোগ। ঘর-বাড়ীর ক্ষেত্রেও ভাড়ার মাধ্যমে টাকা ওঠানো যেতে পারে। পরিকল্পনায় গরীব মানুষের বসবাসের জায়গা থাকতে হবে, জায়গাটা এমন হতে হবে যেন তাদের কর্মস্থলের কাছাকাছি হয় ।

এখন এই জায়গাগুলো বের করা মুশকিল। ঢাকা শহরে জমির দাম অত্যধি, ফরিদপুর বা ময়মনসিংহে কম, কিন্তু কর্মস্থল থেকে দূরে । এই দুই প্রান্তকে কাছাকাছি আনতে হলে পরিকল্পিত পদক্ষেপ চাই। তোমাকে যথাসম্ভব কর্মস্থলগুলো ডিসেন্ট্রালাইজ করতে হবে অর্থাৎ অন্যান্য শহরে নিয়ে যেতে হবে আবার, যে সব কর্মকান্ড ঢাকা থেকে সরানো আদৌ সম্ভব নয় সেগুলির জন্য প্রয়োজনীয় হাউজিং গড়ে তুলতে হবে । যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা গ্রহনযোগ্য হয় তাহলে একটা কার্যকর পলিসি তৈরী করা সম্ভব এবং সে অনুযায়ী আমরা অগ্রসর হতে পারি।

তৌফিক উৎপল: এখানে একটা ফাঁক থাকছে বলে মনে হয়। পলিসি হলো, কি বাস্তবায়ন পদ্ধতি আসবে একটা অনুসারে, আপনি'ত কঠোর পরিকল্পনার পক্ষে নন, তাহলে পরিকল্পনাটা কেমন হবে?

হারুন উর রশীদ: পলিসি থাকল গরীব মানুষের জন্য আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার। তার জন্য প্রাথমিক অর্থ যোগাতে হবে। পরিকল্পনা অনেক ধাপ আছে। তুমি স্থান নির্বাচন করবে পলিসির আলোকে, আবার স্থানীয় পরিকল্পনায় স্থানীয় বিষয়গুলো চলে আসবে। এই পর্যায়ে যাদের জন্য পরিকল্পনা তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। আমেরিকায় আমাদের এক শিক্ষক ছিলেন, 'মাস পড়াতেন আর ছ'মাস ফিলিপাইনের বস্তিতে থাকতেন। একেক বার একেক বস্তিতে, সেখানে গিয়ে একটা ঘর তুলতেন, তারপর বস্তির লোকজনের সাথে মিশতেন । একটা ড্রইং তৈরী করে, সবাইকে নিমন্ত্রণ করতেন বিয়ার পানের। ওরা’ত বিয়ারের পাগল, সবাই আসত, বিয়ার ফ্রী, তাদের সাথে আড্ডার ফাঁকে তার ড্রইংটা বের করতেন, দেখাতেন, তোমার ঘরটা যদি ৫ ফুট ওদিকে সরিয়ে নাও তাহলে এখানে একটা রাস্তা হয়, তাতে তোমার কি উপকার, অন্যান্যদের কি উপকার । তখন তারাও অংশগ্রহন করত, এভাবে দেখা যেত তার ড্রইং এর হয়ত আমূল পরিবর্তন হয়েছে। তাদের কথা অনুযায়ী পরিবর্তিত প্লানের একটা মডেল হতো। এর পর ছবি তুলতেন, তারপর আবার তাদের নিমন্ত্রণ করতেন এভাবে কয়েক সপ্তাহ পরে এত সুন্দর একটা প্লান তৈরী হ'ত যে একজন প্লানার এত সুন্দর চিন্তা করতে পারবে না । ভারতের বিখ্যাত স্থপতি চার্লস কোরিয়ার একটা উক্তি আছে, গরীব মানুষকে বাড়ী বানানো শেখানো অনেকটা গ্রামের মহিলাদের রান্না শেখানোর সমান। তারা যেটা জানে সেটা তোমার শেখানোর দরকার কি?

তৌফিক উৎপল: আপনার কথা থেকে যা বুঝছি তা হলো যাদেরকে আমরা এখানে সাহায্য করতে চাচ্ছি, তারা জানে তাদের বাড়ী কিভাবে বানাতে হয়, তাদের বাড়ী বানানোর সলিউশন দেবার প্রয়োজন নাই । তাদের শুধু অর্গানাইজ করে দিতে হবে। যেসব ব্যাপারে সাহায্য দরকার শুধু সে সব জায়গায় সাহায্য করা। এটা হচ্ছে planning question, বাড়ীর technological question নয়।

হারুন উর রশীদ: ঠিক, আমি এটাই বলতে চাচ্ছি । টেকনোলজি তাদের দেয়া যেতে পারে option হিসাবে কিন্তু নির্মাণ হবে local experience এর উপর নির্ভর করে। মনেকর, তারা যে বাঁশটা ব্যবহার করছে তা এক বছরের মধ্যে পচে যাবে, তুমি বাঁশকে দীর্ঘস্থায়ী করার উপায় শিখিয়ে দিলে । খরচ একটু বেশী হয়, কিন্তু তার ক্ষমতার মধ্যে থাকলে সে সেটা গ্রহন করবে। এক লোককে জানতাম কর্ণেল মতিন। মৌলভী বাজারে কাজ করছে stabilized soil block নিয়ে। বৃটিশ সরকার টাকা দিয়েছে চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য বাড়ী করে দেবার জন্য, সে কি করেছে জান? সে ঐ জায়গায় চলে গেছে, কয়েকটা বাড়ী বানিয়েছে ঐ মাটির ব্লক দিয়ে, মৌলভী বাজারে খুব বৃষ্টি হয়। সয়েল ব্লক পানিতে থাকলে ধ্বসে যাবে, কিন্তু বিশেষ কিছুই হয়নি । সে রিইনফোর্স করেছে মানুষের চুল দিয়ে, নাপিতের দোকানে টোকাই পাঠিয়ে চুল নিয়ে এসেছে। এক একটা ব্লকে খুব অল্প চুল লাগে। শুকালে ব্লকগুলো ভীষণ শক্ত হয়, কাদা অবস্থায়ই টেনে আলাদা করা কঠিন, প্রকৃতিতে গাছ যেমন মাটিকে আকড়ে ধরে রাখে । এই হলো তোমার টেকনোলজি ট্রান্সফার। কনক্রিটের কথাই ধর, আজকাল গ্রামেও খুব কনক্রিট ব্যবহার হচ্ছে। উত্তরবঙ্গে দেখলাম যারা আগে ল্যাট্রিনের চাক বানিয়ে বিক্রি করত তারা এখন গরুকে খাওয়ানোর জন্য যে পাত্রগুলো ব্যবহার হয় ওগুলোও তৈরী করছে। ওরা এখন অনেক কিছু বানায়, বাড়ীর ভেন্টিলেটর, পাইপ, ইলেকট্রিক পোল, বাড়ীর খুটি অনেক রকম। গ্রামের বাড়ীগুলোতে সেই কাঠের পোল ঠিক রেখে, পানিতে নীচেরটুকু নষ্ট হয়ে যায় তার জন্য ছোট পোল বানিয়ে উপরে কাঠের অংশটুকু সাথে নাট-বলটু দিয়ে জুড়ে দিচ্ছে। এছাড়া পুরানো অনেক টেকনিক আছে যেগুলো ভাল কিন্তু এখনও সারা দেশে প্রচলিত নয়। যেমন তুমি যদি সিলেটের তামাবিলে যাও দেখবে বাঁশের বেড়ার দুপাশে মাটি দিয়ে প্লাস্টারের মত করে ভরাট করে উপরে চুনকাম করে দেয়, তুমি সিমেন্ট প্লাস্টারও করতে পার। দেখতে খুবই সুন্দর লাগে, একে একরা কনস্ট্রাকশন বলে। আমাদের পৈত্রিক বাড়ীতে ছিল। চট্টগ্রামে মেহমান আসলে যেখানে বসতে দেয়, তাকে বলে দেউড়ি। মূল বাড়ীর বাইরে থাকে এই ঘরটা। আমাদের ঐ ঘরটা খুব সুন্দর লাগত । কাঠের খুটি যেটুকু মাটির ভিতর থাকে সেখানে উইপোকার আক্রমন ঠেকানোর জন্য পুড়িয়ে ইঞ্চি পরিমান কয়লা করা হত, উইপোকা'ত আর কয়লা খাবে না।

তৌফিক উৎপল: পোড়ায় কি করে? মোবিল লাগিয়ে?

হারুন উর রশীদ: না, স্রেফ আগুন জ্বালিয়ে তার মধ্যে রেখে দেয়, কতক্ষণ পোড়াতে হবে তা ওদের জানা আছে। আমি ছাত্রদের বলি, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই বলে ভেব না ঐ লোকটার চেয়ে আমি বেশী জানি। অনেক ক্ষেত্রে, ঐ গ্রামের লোকটা যা জানে, আমি তুমি তার মত জানি না। আমরা অনেক সময় 'অশিক্ষিত' আর 'নিরক্ষর' একই অর্থে ব্যবহার করি। এটা কিন্তু ভুল, কেউ নিরক্ষর হতে পারে কিন্তু অশিক্ষিত না। চাঁদে কিভাবে মানুষ যাচ্ছে এটা তার জানার কোন দরকার নাই । কোন মাসে কোন দিনে গাছ লাগাতে হয় বা চাষ করতে হয়, সেটা জানাই তার জন্য যথেষ্ট। ইংরেজী একটা সিনেমা আছে 'গডস মাস্ট বি ক্রেজী', একটা ট্রাইবাল লোক প্রতিদিন কাঠ কাটতে যায় জঙ্গলের ভিতর, একদিন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে তাও ফিরছে না, তার গিন্নী ছোট ছেলেটাকে পাঠালো খোঁজ নিতে, ছোট ছেলেটা গিয়েছে, সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, এক হায়না তার পিছু নিয়েছে। হায়না নাকি তার চেয়ে উঁচু কোন কিছুকে আক্রমণ করে না, ঐ ছেলেটা তাড়াতাড়ি একটা গাছের ডাল মাথার উপর ধরেছে। এই জ্ঞানটা যদি ঐ ছেলেটার না থাকত তাহলে সে হায়নার পেটে যেত। আমার তোমার কিন্তু সেই নলেজের দরকার নেই। হাসান ফাথির নাম নিশ্চয়ই শুনেছ, মিশরের বিখ্যাত স্থপতি। বড় লোকের ছেলে, টাকা পয়সার অভাব নাই, সারা জীবন মাটির বাড়ী নিয়ে গবেষণা করেছে, প্রাইজ-ট্রাইজ অনেক পেয়েছে। ঠিক করল মাটির বাড়ী বানাবে, ১৫ ফুট দৈর্ঘ্য ১০ বা ১২ ফুট প্রস্থ একটা ঘর, ছাদটাও মাটি দিয়ে করবে সে। এখন সমস্যাটা হল, সাটারিং করলে পরে খুলে নিলে ছাদ ভেঙ্গে পড়ে যায়, ছবিতে দেখেছে এরকম বাড়ী কিন্তু তৈরী করতে পারছে না। তার বড় ভাই আসওয়ান এলাকায় (আসওয়ানে নীল নদের উপরে বিখ্যাত বাঁধ আছে) নির্মাণ কাজের সাথে জড়িত। সে ভাইয়ের কাছে জানতে পারল, আসওয়ানে এখনও ওরকম ঘর বানায়, ফাথি আসওয়ানে গিয়ে ওই কারিগর ধরে আনল, নিজের ঘরটা দেখাল এই ঘরের ছাদ করে দিতে পারবে?' সে বলে, 'পারব' কতক্ষণ লাগবে, 'প্রায় আধা বেলা' ঐ লোকটা করলো কি, একদিকে দেয়ালে একটা আর্চ আকলো এবং ঐ আর্চটিকে হিসাবে ব্যবহার করে একটা প্যারাবোলিক আঁকলো, সেটা থেকে হিসাব করে ছাদ বানিয়ে ফেলল। প্যারাবোলিক আর্চ (খিলান) হল একমাত্র আর্চ যার কোথাও কোন টেনশন (tension) আসে না । সব পয়েন্টেই কমপ্রেশান (compression) মাটি কিছুটা কমপ্রেশন নিতে পারে কিন্তু টেনশন নয়। ওই মিস্ত্রিকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় সে হয়ত উত্তর দিতে পারবে না, কিন্তু সে জানে কেমন করে করতে হয়।

তৌফিক উৎপল: তাহলে আপনার মতে, গরীব মানুষের ক্ষেত্রে যার বাড়ী তাকেই বানাতে দেয়া উচিত। টেকনোলজীর উন্নয়ন প্রচার প্রপাগান্ডার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে ভাল।

হারুন উর রশীদ: হ্যাঁ, প্রচারের জন্য কিছু পুস্তিকা থাকতে পারে। স্থানীয় ভিত্তিতে ওয়ার্কশপ করে নতুন প্রযুক্তি শেখানো যেতে পারে। কিন্তু চয়েসটা তার নিজের, বাধ্য করা উচিত নয়। তবে সার্ভিসগুলোর সংস্থানে নজর দিতে হবে। চয়েসটা দিলে সে নিজেই নিজের অবস্থার উন্নতির চেষ্টা করবে, তার target হবে ওটা অর্জন করা। তুমি চাপিয়ে দিলে সে ওটা বিনা পয়সায় চাইবে। এই দেশে হাজার বছর ধরে মানুষ বাস করে, তারা যে ঘর-বাড়ীতে থেকেছে তা সবই নিকৃষ্ট, তা হতে পারে না। এমন কথা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্যও নয় । আবার অন্য দিকে প্রযুক্তির উন্নতি হয় এবং মানুষ তা গ্রহনও করে। তুমি যদি কোন প্রযুক্তি খুব বেশী প্রচার কর তাহলে বুঝে বা না বুঝে অনেকেই গ্রহন করবে, কিন্তু এতে uniform উন্নতি হবে না। বাড়ীতে এয়ার কন্ডিশন লাগানোর জন্য তুমি সব জানালা বন্ধ রাখতে পার, কিন্তু বাড়ীর শিশুদের মানসিক বিকাশ ভিন্ন খাতে চলে যাবে। ঘর-বাড়ী কিন্তু সমাজের ভিত্তি, একসাথে বসবাসের উপসর্গ, বসবাস পরিকল্পনায় সমাজের মানুষের মতামতকে উদারভাবে গ্রহন করতে হবে, তাদের জন্য নিজের অবস্থা উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এসব পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন, প্রয়োজন ভাল শাসন ব্যবস্থা (Good governance)গরীবদের এগোতে দাও, তাদের সামনে বাঁধা সৃষ্টি যেন না হয়।

তৌফিক উৎপল: আমাদের আলোচনার প্রসঙ্গ ছিল কিভাবে শহরে গরীবদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। আপনি অনেক মূল্যবান কথা বলেছেন, যাদের জন্য ঘর-বাড়ী তাদের সম্পৃক্ততার কথা বলেছেন। সর্বোপরি দেশের শহরগুলোতে আবাসন উন্নয়নের পলিসির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। আপনার এই আলোচনা আমাদের পাঠকদের কাছে আমরা তুলে ধরব। আশাকরি ভবিষ্যতেও এধরনের আলোচনায় আপনার মতামত ও সহযোগীতা আমরা পাব। আপনাকে স্থাপত্য ও নির্মাণের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।

হারুন-অর-রশিদ: স্থাপত্য ও নির্মাণকেও ধন্যবাদ।


 

আপনার মতামত দিন

কমেন্ট

Logo
Logo
© 2026 Copyrights by Sthapattya o Nirman. All Rights Reserved. Developed by Deshi Inc.